প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন নিয়ে গত মৌসুমে মাছ আহরণ ও শুঁটকি তৈরির উদ্দেশ্যে দুবলার চরে গিয়েছিলেন রুহুল গাজী ও আমজাদ। উভয়ের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালী গ্রামে অবস্থিত। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তারা পর্যাপ্ত মাছ পাননি। ফলে বিপুল পরিমাণ টাকার লোকসান গুনতে হয়েছে তাদের। দাদনের টাকা শোধ করার সক্ষমতা তাদের হয়নি। সেই বোঝা মাথায় নিয়েই এবার নতুন করে দাদন নিয়ে সাগরে রওনা হচ্ছেন তারা।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে মোংলা নদীর ফেরিঘাটে রুহুল ও আমজাদকে দেখা যায়। তারা সাগরে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, অন্যান্য জেলেদের সঙ্গে। আজ শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে সুন্দরবনের দুবলার চরের শুঁটকি মৌসুম। এই মৌসুম চলবে আগামী বছরের মার্চের শেষ পর্যন্ত। এ উপলক্ষে মোংলার উপকূলীয় নদনদীতে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত রুহুল-আমজাদের মতো কয়েক হাজার জেলে জড়ো হয়েছেন। গতকাল রাতে তাদের মধ্যে কেউ কেউ যাত্রা শুরু করেছেন। অনেকের আজ শুক্রবার ভোরে সাগরে রওনা হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। জাল, বরফ, খাবার, জ্বালানি ও মাছ ধরার অন্যান্য সরঞ্জাম কিনে ট্রলার প্রস্তুত করতে তাদের সকলকেই মহাজনের কাছে হাত পাততে হয়েছে।
আমজাদদের নৌবহরে মোংলার সোনাইলতলা গ্রামের জেলে রামকৃষ্ণ (৪৮) রয়েছেন। তিনি জানান, বাপ-দাদার পেশা মাছ ধরা ও শুঁটকি তৈরির সঙ্গে তিনি ছোটবেলা থেকেই যুক্ত। গত মৌসুমের শেষ দিকে বনদস্যুদের ব্যাপক উৎপাতের কারণে তারা মাছ ধরা বন্ধ রাখতে বাধ্য হন। এবারের মৌসুম শুরুর আগেই বন ও সাগরে দস্যুদের তৎপরতার খবর শুনে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তবুও জীবিকার তাগিদে দস্যু-আতঙ্ক নিয়েই সাগরে যেতে হচ্ছে তাদের সকলকে।
পাঁচ মাসের মৌসুমে জেলেদের ভরসা সাগরের মাছ। মাছ ধরা পড়লেও দস্যুদের চাঁদা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি পুষিয়ে ঋণ পরিশোধের চিন্তায় রয়েছেন তারা। সাগরে মাছ না পাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকির মতো বহুমুখী সংকট মাথায় নিয়েই হাজারো জেলে দুবলার চরে শুঁটকি উৎপাদনে যাচ্ছেন।
মোংলার চিলা গ্রামের জগদীশ মণ্ডল (৩৮) ২০ জন জেলের পাঁচটি নৌকার বহর নিয়ে সাগরে যাচ্ছেন। তাদের দলের কেউ কেউ মহাজনের কাছ থেকে পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়ে মাছ ধরার প্রস্তুতি নিয়েছেন। কিন্তু সাগরে দস্যুর হানা নিয়ে তারাও চিন্তিত। মাছ আহরণ করতে গিয়ে যদি তারা দস্যুদের কবলে পড়েন, তাহলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও বড় ঝুঁকিতে পড়তে হবে তাদের।
জেলে বরাম সরদার (৪২) জানান, গত মৌসুমে সাগরে তেমন মাছ পাননি। দস্যুদের উৎপাত ও ভারতীয় জেলেদের উপস্থিতির কারণে গভীর সমুদ্রে যেতে পারেননি। এবারের মৌসুমেও পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যাবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
খুলনার দাকোপ উপজেলার ঢাংমারী গ্রামের জেলে সিদিব বালা (৩০) জানান, গত মৌসুমে কয়েক দফা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সাগরে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যায়নি। এবারে দুর্যোগ না হলে ভালো মাছ পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, মৌসুম ঘিরে এবার দুবলার চরের আলোরকোল, অফিসকেল্লা, নারকেলবাড়িয়া ও শেলার চরে প্রায় ১০ হাজার জেলে ও মহাজনের সমাগম হতে পারে। তাদের থাকার জন্য ৯০০টি অস্থায়ী ঘর, মাছ বেচাকেনার জন্য ১০০টি ডিপো এবং মুদি, তেল, ওষুধ, সেলুন ও খাবারের দোকানসহ বিভিন্ন পণ্যের ১০০টি দোকানের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শুঁটকি উৎপাদন, মাছ আহরণ, পরিবহন ও বেচাকেনাসহ সংশ্লিষ্ট কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৌসুমে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়।
দুবলার চর ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ জানান, দস্যুদের তৎপরতায় শুঁটকি ব্যবসা অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। গত মৌসুমে ব্যবসায়ীদের দস্যু বাহিনীগুলোকে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে।
এদিকে জেলেদের নিরাপত্তায় বন বিভাগ সতর্কতামূলক নির্দেশনা দিয়েছে। গভীর সমুদ্রে একা না যাওয়া, রাতে ১৫ থেকে ২০টি নৌকা একসঙ্গে অবস্থান করা ও সুন্দরবনের গহিনে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্টে বনরক্ষী মোতায়েনের পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ও কোস্টগার্ড বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে। এসআরবি ৬-এর অধিনায়ক নিস্তার আহমেদ জানান, ইতোমধ্যে ছয়টি বনদস্যু বাহিনীর ৭৪ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেছেন। দুবলার চরে এসআরবির অস্থায়ী ক্যাম্প রয়েছে।
কোস্টগার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, আসন্ন শুঁটকি আহরণ মৌসুমে মৎস্যজীবীদের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিতে কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে।
গত শুঁটকি মৌসুমে বন বিভাগের রাজস্ব আয় হয়েছিল সাড়ে সাত কোটি টাকা। এ তথ্য জানিয়ে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, এবার তাদের আট কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে দস্যুদের কারণে জেলে ও মহাজনদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি রাজস্ব আদায়েও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোস্টগার্ডকে রাতের টহল জোরদারে তারা অনুরোধ করেছেন।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম জানান, জেলেদের চিকিৎসার কথা বিবেচনা করেই এবার প্রথমবারের মতো ফ্রেন্ডশিপের ভাসমান হাসপাতালের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাঁচ মাস ধরে সেখানে চিকিৎসা দেওয়া হবে। সুন্দরবনে দস্যুতা নির্মূলে কোস্টগার্ডের নেতৃত্বে দুটি অভিযান চলছে। এ কারণে দস্যুতা আগের তুলনায় অনেকাংশে কমেছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন