প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে গত বছরের সামরিক সংঘাতের পর ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্রের প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, ক্ষেপণাস্ত্রটির সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একাধিক উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ব্রহ্মস অ্যারোস্পেস। খবরটি প্রকাশ করেছে আরটি-ইংলিশ।
ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জয়তীর্থ যোশি সম্প্রতি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ক্ষেপণাস্ত্রটির কার্যক্ষমতা এবং পরিচালনাগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন সংস্করণ তৈরির কাজও চলছে।
ব্রহ্মস নামটি এসেছে ভারতের ব্রহ্মপুত্র ও রাশিয়ার মস্কভা নদীর নাম থেকে। এই ক্ষেপণাস্ত্রটি স্থল, সমুদ্র এবং পানির নিচের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে উৎক্ষেপণ করা যায় এবং এটি নির্ভুলভাবে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
গত বছর ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পরিচিত অভিযানে ভারত ব্রহ্মস ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ ও সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পাকিস্তানের যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গারও ছিল।
ভারতের দাবি, ওই সংঘাতে ব্রহ্মসের কোনো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা যায়নি। এর পর, বিভিন্ন দেশের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রটি কেনার বিষয়ে আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাড়ছে ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা
ব্রহ্মসের প্রাথমিক সংস্করণ ছিল স্থল থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। শব্দের গতির প্রায় তিন গুণ গতিতে চলতে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্র ২০০ থেকে ৩০০ কেজি ওজনের ওয়ারহেড বহন করতে পারে। শুরুতে এর পাল্লা ছিল ২৯০ কিলোমিটার। ধারাবাহিক উন্নয়নের মাধ্যমে এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
২০২৩ সালে ভারতীয় বিমানবাহিনী ৪৫০ কিলোমিটার পাল্লার একটি সংস্করণের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। ‘ব্রহ্মস-এ’ নামে পরিচিত এই সংস্করণটি এসইউ-৩০এমকেআই যুদ্ধবিমানে ব্যবহার করা যায়। এর ফলে, ভারতীয় বিমানবাহিনী দূর থেকে শত্রুর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নির্ভুলভাবে আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
এছাড়া, ব্রহ্মসের ব্লক-৩ সংস্করণটি স্থলভিত্তিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এটি ভূমির খুব কাছ দিয়ে উড়ে অপ্রত্যাশিত দিক থেকে লক্ষ্যবস্তুর কাছে পৌঁছাতে সক্ষম। ফলে, শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রতিহত করা কঠিন হতে পারে।
আসছে হালকা সংস্করণ ব্রহ্মস-এনজি
ব্রহ্মস অ্যারোস্পেসের অন্যতম বড় প্রকল্প হলো ব্রহ্মস-এনজি। এটি হবে তুলনামূলকভাবে হালকা এবং আকাশ থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র। ভারতের তেজসসহ আরও কয়েক ধরনের যুদ্ধবিমানে এটি ব্যবহার করা যাবে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসইউ-৩০এমকেআই যুদ্ধবিমান থেকে একসঙ্গে তিনটি ব্রহ্মস-এনজি ক্ষেপণাস্ত্র বহন ও নিক্ষেপ করা সম্ভব হবে। নতুন সংস্করণে ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি উপাদানের ব্যবহার বৃদ্ধি করা হবে। পাশাপাশি এতে উন্নত উপকরণ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৭-২৮ সালের মধ্যে এই ক্ষেপণাস্ত্রের প্রাথমিক পরীক্ষামূলক মডেল উন্মোচনের প্রত্যাশা করছে ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠানটি।
১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রস্তাবিত এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা হতে পারে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার। তবে প্রকল্পটি এখনো ধারণাগত পর্যায়ে রয়েছে।
জয়তীর্থ যোশির ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা বাড়ানোর কাজ ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর কার্যক্ষমতা যাচাই করতে স্থল, সমুদ্র এবং আকাশ থেকে পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করা হবে। এ বিষয়ে রাশিয়ার অংশীদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
এদিকে, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পরিকল্পনাও করছে ব্রহ্মস অ্যারোস্পেস। ‘ব্রহ্মস-২’ নামে পরিচিত এই প্রকল্পে শব্দের গতির পাঁচ গুণ বা তার বেশি গতিতে চলতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত এই ক্ষেপণাস্ত্রে বায়ু থেকে অক্সিজেন গ্রহণকারী স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিন ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রকল্পটি এখনো উন্নয়ন ও পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে।
বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে
ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্রের অন্যতম প্রথম বিদেশি ক্রেতা ফিলিপাইন। ২০২২ সালে দেশটির সঙ্গে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের চুক্তি করে ভারত। ২০২৪ সালের এপ্রিলে প্রথম চালান এবং ২০২৫ সালের এপ্রিলে দ্বিতীয় চালান সরবরাহ করা হবে।
এছাড়া, ভিয়েতনামকে ক্ষেপণাস্ত্রটি সরবরাহের বিষয়ে চুক্তির কথা চলতি বছরের জুনে নিশ্চিত করেছে ভারত। ইন্দোনেশিয়াও এটি কেনার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং সংগ্রহের পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়েছে।
মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, মিসর, চিলি ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ এক ডজনের বেশি দেশ ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা মূল্যায়ন করেছে অথবা কেনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তুতি
ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর একটি হলো ব্রহ্মস। এই প্রকল্পটি দেশটির অস্ত্র আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বর্তমানে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে ব্রহ্মস অ্যারোস্পেস। সম্প্রতি, আরো যুদ্ধজাহাজে ক্ষেপণাস্ত্রটি যুক্ত করতে অতিরিক্ত উৎক্ষেপণব্যবস্থা ও অগ্নিনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কেনার চুক্তি করেছে ভারত।
ভারতের হায়দরাবাদ, নাগপুর, পিলানি ও লক্ষ্ণৌতে ব্রহ্মসের উৎপাদনকেন্দ্র রয়েছে। পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য বিশেষ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে গবেষণা ও উন্নয়নকেন্দ্রও স্থাপন করা হয়েছে।
চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিটি ব্যবস্থা ও উপব্যবস্থার জন্য শিল্প সহযোগীর সংখ্যা বর্তমানের এক বা দুজন থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৪৫ জন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ভারত ২০২৯ সালের মধ্যে বার্ষিক প্রতিরক্ষা উৎপাদন ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত করতে চায়। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ৫৫০ কোটি ডলার। গত মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরে দেশটির প্রতিরক্ষা রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৬৭ শতাংশ বেড়ে ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন