প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
হরমুজ প্রণালী সংকটের মধ্যেও, বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন চললেও গত কয়েক মাস ধরে জ্বালানি তেলের দাম খুব বেশি বৃদ্ধি পায়নি। যুদ্ধের পূর্বের তুলনায় হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারের চলাচল যদিও সীমিত হয়েছে, তথাপি গত ছয় মাসে অপরিশোধিত তেলের ফিউচার মূল্য খুব কমই ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
এদিকে, সংশ্লিষ্টরা খুব বেশি আশা প্রকাশ করছেন যে যুদ্ধ শেষ হবে এবং সংকটের সমাধান হবে। যা জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে আনবে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতির জ্বালানি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ডিজেলের সরবরাহ কমে আসছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একদিকে কৃষি খাতের চাহিদা বৃদ্ধি এবং অন্যদিকে যুদ্ধের জন্য সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় ডিজেলের দাম বেড়ে চলেছে। ডিজেল ক্র্যাক স্প্রেড, অর্থাৎ এক ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এবং তা থেকে পরিশোধিত ডিজেলের দাম, এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ উভয় স্থানেই রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
অপরিশোধিত তেলের বাজার মূলত নিকট ভবিষ্যতের সরবরাহ নিয়ে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা প্রকাশ করে। কিন্তু ডিজেলের বাজার, তেল পণ্যের বাস্তব সরবরাহ-সংকটের স্পষ্ট সংকেত প্রদান করছে। এই বছর ডিজেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি, অথচ এর প্রাপ্যতা এবং দাম অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল ক্র্যাক স্প্রেড প্রথমবারের মতো তিন অঙ্কে পৌঁছেছে। গত সোমবার অপরিশোধিত তেলের দামের তুলনায় ডিজেলের প্রিমিয়াম ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ ১০২ ডলারে উঠেছিল।
ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ ডিজেলের বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে রাশিয়া পর্যন্ত জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সময়ে, অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সুরক্ষিত রাখার জন্য কয়েক মাস ধরে বিধিনিষেধের পর, চীনের জ্বালানি রপ্তানি এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে ঘুরে দাঁড়ায়নি।
হরমুজ প্রণালী বেশিরভাগ সময় বন্ধ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া ও চীন থেকে হারিয়ে যাওয়া ডিজেল সরবরাহের ঘাটতি পূরণ করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের শোধনাগারগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাচ্ছে। কিন্তু এর ফলে স্বস্তি আংশিকভাবে এসেছে। কারণ বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যম-ডিস্টিলেট জ্বালানির মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এই সময়ের জন্য মজুত পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় ১২ শতাংশ কম।
রেকর্ড পরিশোধন মুনাফার কারণে অনেক শোধনাগার সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণও পিছিয়ে দিচ্ছে এবং প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করছে। ফলে ডিজেলের বাজারে কোনো বড় বাধা বা অপ্রত্যাশিত উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে নতুন রেকর্ড উচ্চতায় দাম ওঠার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
জ্বালানি প্রবাহ বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সারের জ্যেষ্ঠ তেল বাজার বিশ্লেষক রোহিত রাঠোড বলেন, “বিশ্বজুড়ে শোধনাগারগুলোর মুনাফা প্রায় রেকর্ড পর্যায়ে রয়েছে, যার প্রধান কারণ গুরুতর এবং ক্রমশ অবনতিশীল ডিজেল ঘাটতি।”
ইউক্রেনের ড্রোন হামলার পর রাশিয়ার শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, ফলে রাশিয়া ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। অন্যদিকে, ইরানের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী সংকটে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পরিবহন সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এই দুই অঞ্চল থেকে ডিজেলের প্রাপ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ভরটেক্সারের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে ডিজেল ও গ্যাসঅয়েল রপ্তানি ৫০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। প্রতিদিন প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল থেকে কমে এখন মাত্র ১৬ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মজুত কমে যাওয়ার সঙ্গে বৃদ্ধি পাওয়া চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বৈশ্বিক ডিজেল বাজার অত্যন্ত সংকটপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর ফলস্বরূপ, দামও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম এক মাসে ৮ শতাংশ বেড়েছে এবং এক বছর আগে গড় দামের ৩.৬৯ ডলারের তুলনায় ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
আগামী কয়েক সপ্তাহে ডিজেলের চাহিদা আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অনেক দেশে কৃষকেরা ফসল কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ট্রাকচালকেরা ছুটির মৌসুমের আগে দোকানগুলোতে পণ্য মজুত করার জন্য বেশি পণ্য পরিবহন করব, এবং শীতকালে গরমের জ্বালানি হিসেবে দেশে গ্যাসঅয়েল কিনবে।
উচ্চ দামের কারণে পেট্রলের চাহিদায় কিছুটা পতন দেখা দিতে পারে, কিন্তু ডিজেলের চাহিদা সহজে কমবে না। অর্থাৎ দাম বৃদ্ধির পরেও এর ব্যবহার কমানো কঠিন। এনার্জি এসপেক্ট এর রবার্ট ক্যাম্পবেল ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, “ডিজেল শিল্প অর্থনীতির প্রাণ, এটিকে হঠাৎ করে বন্ধ করা যায় না।”
অর্থনীতির জন্য এই জ্বালানি অপরিহার্য। ফলে সামনে ডিজেলের দাম আরও বাড়তে পারে, যা পণ্যের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের শুরুর মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোক্তাদের (ভোটারদের) পকেটে আরো চাপ সৃষ্টি করবে।
সূত্র: অয়েলপ্রাইসডটকম।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন