প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চলতি অর্থবছরের শুরুতেই বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। রপ্তানির তুলনায় আমদানি দ্বিগুণের বেশি হারে বেড়ে যাওয়ায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই-আগস্টে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ৩৮২ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২৯৬ কোটি ২০ লাখ ডলার। এই হিসাবে দেখা যায়, এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৮৬ কোটি ডলার বেড়েছে, যা ২৯ শতাংশের বেশি। একই সময়ে রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, কিন্তু আমদানি বেড়েছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ। ফলে বৈদেশিক লেনদেনে রেমিট্যান্সের ইতিবাচক অবদান থাকলেও আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্যহীনতা অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টে রপ্তানি আয় ৮৩৮ কোটি ডলার হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৭৯২ কোটি ৪০ লাখ ডলারের তুলনায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। বিপরীতে, আমদানি ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২২০ কোটি ডলারে, যেখানে আগের বছর ছিল ১ হাজার ৮৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আমদানি বেড়েছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ, রপ্তানি যতটা বেড়েছে, আমদানি তার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির পাশাপাশি সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনেও চাপ তৈরি হয়েছে। জুলাই-আগস্টে ওভারঅল ব্যালান্সে ঘাটতি ৬৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ থেকে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহের কারণে চলতি হিসাব এখনো উদ্বৃত্ত রয়েছে। দুই মাসে চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত ৫৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
বাণিজ্য ঘাটতির মূল কারণ হচ্ছে আমদানির দ্রুত বৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পণ্যভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, জুলাই-আগস্টে কাস্টমসের হিসাবে মোট আমদানি ১ হাজার ২৮৯ কোটি ৫৮ লাখ ডলার হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি ছিল ১ হাজার ১৪৯ কোটি ৩২ লাখ ডলার। এ হিসাবে আমদানি বেড়েছে ১২ দশমিক ২ শতাংশ।
আমদানি বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চাপ এসেছে মধ্যবর্তী পণ্য থেকে। এ খাতে দুই মাসে আমদানি ব্যয় ৮৪৬ কোটি ২৮ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৭১০ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। অর্থাৎ, মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি বেড়েছে ১৯ দশমিক ১ শতাংশ।
এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের আমদানি। জুলাই-আগস্টে এসব পণ্য আমদানিতে ব্যয় ২৪৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার হয়েছে, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ১২৪ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। অর্থাৎ, এক বছরে এ খাতে আমদানি দ্বিগুণ হয়েছে; প্রবৃদ্ধি ১০০ শতাংশ।
পেট্রোলিয়াম, অয়েল ও লুব্রিকেন্টস বা পিওএল আমদানির পরিমাণ ২২৮ কোটি ২৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের ১০৫ কোটি ৭২ লাখ ডলারের তুলনায় ১১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। ফলে জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
শুধু জ্বালানি নয়, শিল্প উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানিও বেড়েছে। তৈরি পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানিতে জুলাই-আগস্টে ব্যয় ২৯২ কোটি ৫৪ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৮৭ কোটি ৩১ লাখ ডলার। এ খাতে প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৮ শতাংশ।
কাঁচা তুলা আমদানি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। তবে সুতা আমদানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং টেক্সটাইল ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি বেড়েছে ৩ দশমিক ২ শতাংশ।
অন্যান্য মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি বেড়েছে ২ শতাংশ। এর মধ্যে তেলবীজ আমদানি বেড়েছে ৯৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ওষুধজাত পণ্যের আমদানি বেড়েছে ৭৫ দশমিক ১ শতাংশ। রাসায়নিক পণ্যের আমদানি বেড়েছে ৬ দশমিক ১ শতাংশ এবং প্লাস্টিক ও রাবারজাত পণ্যের আমদানি বেড়েছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
তবে আমদানির সব খাতে বৃদ্ধি ঘটেনি। লোহা, ইস্পাত ও অন্যান্য বেস মেটালের আমদানি ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে এবং সার আমদানি ৯ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে।
বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও দেশের ভবিষ্যৎ উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত মূলধনি পণ্য আমদানিতে বরং বড় পতন দেখা গেছে। জুলাই-আগস্টে মূলধনি পণ্য আমদানি ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে।
এ সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে ব্যয় ৫০ কোটি ৬৯ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭৫ কোটি ৭ লাখ ডলার। ফলে এ খাতে আমদানি কমেছে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যান্য মূলধনি পণ্যের আমদানিও কমেছে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।
অর্থাৎ, আমদানি বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উৎপাদন ও ভোগের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি এবং মধ্যবর্তী পণ্য থেকে; বিপরীতে বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে।
অন্যদিকে রপ্তানি খাতে প্রবৃদ্ধি থাকলেও তা আমদানির তুলনায় অনেক কম। জুলাই-আগস্টে মোট রপ্তানি শিপমেন্ট ৯১৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৮৬৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
রপ্তানিতে প্রধান অবদান তৈরি পোশাকের। দুই মাসে নিটওয়্যার রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪১৮ কোটি ৭৩ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ৩৯৩ কোটি ৫২ লাখ ডলারের তুলনায় ৬ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। ওভেন পোশাক রপ্তানি থেকে এসেছে ৩২৯ কোটি ৮১ লাখ ডলার, প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ।
তৈরি পোশাকের বাইরে জুট ও জুটজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ১২ দশমিক ৮ শতাংশ, বিশেষায়িত বস্ত্র ১১ দশমিক ৪ শতাংশ, হোম টেক্সটাইল ১০ দশমিক ৬ শতাংশ এবং পাদুকা ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।
তবে মাছ ও জীবন্ত মাছের রপ্তানি ১০ শতাংশ কমেছে। কৃষিপণ্য কমেছে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং তুলা ও তুলাজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। চিংড়ি রপ্তানিতেও ২০ দশমিক ৩ শতাংশ পতন হয়েছে।
বাণিজ্য ঘাটতির বিপরীতে বৈদেশিক লেনদেনের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো রেমিট্যান্স। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৫৮২ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৪৮৯ কোটি ৯৮ লাখ ডলার। ফলে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
দেশভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে সৌদি আরব থেকে—১১৪ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। আগের বছরের তুলনায় এ দেশ থেকে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ।
যুক্তরাজ্য থেকে এসেছে ৮৫ কোটি ৪৯ লাখ ডলার, যা ৫২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে ৫৪ কোটি ২ লাখ ডলার, প্রবৃদ্ধি ১৯ শতাংশ।
তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়া থেকে রেমিট্যান্স কমেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৫০ কোটি ৫১ লাখ ডলার এসেছে, যা ৮ দশমিক ১ শতাংশ কম। মালয়েশিয়া থেকে এসেছে ৪৩ কোটি ডলার, কমেছে ২০ দশমিক ৯ শতাংশ।
রেমিট্যান্স বৃদ্ধির কারণে বাণিজ্য ঘাটতির চাপ কিছুটা সামলে নিয়েছে চলতি হিসাব। জুলাই-আগস্টে চলতি হিসাবে ৫৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে উদ্বৃত্ত ছিল ১৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
তবে পণ্য বাণিজ্যের বাইরে সেবা ও প্রাথমিক আয় হিসাবে বড় ঘাটতি রয়েছে। দুই মাসে সেবা হিসাবে নিট ঘাটতি ৮৮ কোটি ৩৪ লাখ ডলার হয়েছে। সেবা খাতে আয় বেড়েছে ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ, কিন্তু পরিশোধও বেড়েছে ১ দশমিক ১ শতাংশ।
প্রাথমিক আয় হিসাবে ঘাটতি ৫৯ কোটি ৫৪ লাখ ডলার। তবে আগের বছরের তুলনায় এ ঘাটতি কমেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে ঘাটতি ছিল ৮০ কোটি ৬৫ লাখ ডলার।
বাণিজ্য ঘাটতির পাশাপাশি আর্থিক হিসাবেও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। জুলাই-আগস্টে আর্থিক হিসাবে নিট ঘাটতি ১১৪ কোটি ২০ লাখ ডলার হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এ ঘাটতি ছিল ২৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
‘অন্যান্য বিনিয়োগ’ হিসাবে সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখা গেছে। এ খাতে নিট ঘাটতি ১৩১ কোটি ডলার। মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণপ্রবাহও কমেছে। জুলাই-আগস্টে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ এসেছে ২৯ কোটি ১০ লাখ ডলার, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে এসেছিল ৭৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। অর্থাৎ, এ ধরনের ঋণপ্রবাহ ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে।
বাণিজ্য ঘাটতি, আর্থিক হিসাবের ঘাটতি এবং সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য—সব মিলিয়ে রিজার্ভের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। জুলাই-আগস্টে সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে ঘাটতি ৬৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার হয়েছে। একই পরিমাণ রিজার্ভ সম্পদ কমেছে।
তবে দুই মাস শেষে দেশের স্থূল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৭ হাজার ৩৫২ মিলিয়ন বা ৩৭ দশমিক ৩৫২ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল ৩২ হাজার ৪৪২ মিলিয়ন বা ৩২ দশমিক ৪৪২ বিলিয়ন ডলার। এই রিজার্ভ দিয়ে পণ্য ও সেবার প্রায় ৫ দশমিক ২ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব ছিল।
সামগ্রিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ এবং চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে আমদানি যেভাবে রপ্তানির তুলনায় দ্রুত বাড়ছে, তাতে বাণিজ্য ঘাটতি ক্রমেই বড় হচ্ছে।
বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির ব্যয় দ্বিগুণ হওয়া এবং মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি প্রায় ১৯ শতাংশ বৃদ্ধির বিপরীতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের নিচে থাকায় বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্যে চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমে যাওয়ার বিষয়টিও অর্থনীতির জন্য আলাদা তাৎপর্য বহন করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের হিসাব তাই একদিকে রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন এবং চলতি হিসাবের উদ্বৃত্তের স্বস্তি দিচ্ছে, অন্যদিকে আমদানি-রপ্তানির ব্যবধান দ্রুত বাড়ার কারণে বাণিজ্য ঘাটতিই বৈদেশিক লেনদেনের প্রধান চাপ হিসেবে সামনে এসেছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন