প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায় বিভাগের পৃথককরণ সংক্রান্ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিরোধী দল থাকা অবস্থায় যে সংস্কারের বিরোধিতা করা হয়েছিল, ক্ষমতায় এসে আইএমএফের ঋণের শর্তে সেই একই পদক্ষেপ গ্রহণকে তিনি ‘রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি দীর্ঘ পোস্টে এনবিআর সংস্কার নিয়ে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং রাজস্ব আদায়ের কাল্পনিক লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কে তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন উত্থাপন করেন তিনি।
ফেসবুক পোস্টে হাসনাত লেখেন, ‘‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কার নিয়ে ২০২৫ সালের ২৫ মে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ‘হঠাৎ করেই এনবিআরের ওপর সংস্কার চাপিয়ে দিয়ে রাজস্ব আদায়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে’।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘‘অন্যদিকে গত ২৩ আগস্ট মাননীয় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার কাজটি আধাআধি করে চলে গেছে’ এবং জানিয়েছেন, ‘এনবিআর দুই ভাগ হবে।’’’
‘এই দুই বক্তব্যের মাঝখানে ১৫ মাস। কী নির্মম পরিহাস! বিএনপির মতে, ২০২৫ সালে এনবিআরের নীতি এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করে দুটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা ছিল অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর অথচ ২০২৬ সালে সেটা হয়ে গেল অর্থনীতির জন্য অনিবার্য। কোনটি সত্য, তা সবার জানা প্রয়োজন।’
হাসনাত লেখেন, ‘এক. মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ‘হঠাৎ চাপিয়ে দেওয়া’ বক্তব্যটি তথ্যগতভাবে সঠিক ছিল না। দীর্ঘ কয়েক মাস অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপ, একাধিক আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যাচাই-বাছাইয়ের পর ২০২৫ সালের মে মাসে এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি আলাদা বিভাগ করার অধ্যাদেশ জারি হয়। কর্মকর্তাদের আপত্তির পর সেপ্টেম্বরে সেটি আবার সংশোধন করা হয় এবং সংশোধিত অধ্যাদেশে রাজস্ব ক্যাডারের কর্মকর্তাদেরই নতুন দুই বিভাগের শীর্ষ পদে নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়।’
‘এরপর গত ২১ জানুয়ারি কার্যবিধি সংশোধনের প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আপত্তি শোনা, পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইন সংশোধন করে কোনো সংস্কার শুরু করাকে ‘চাপিয়ে দেওয়া’ বলা যায় না। বরং এটিই একটি যথাযথ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ।’
তিনি আরও লেখেন, ‘দুই. ‘অচলাবস্থা’ নয়, সত্যটা ছিল উল্টো। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছিল আড়াই শতাংশে। সেটি ছিল আন্দোলন ও কর্মবিরতির বছর—যে আন্দোলনকে আজকের সরকারি দলের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছিলেন।’
‘অন্যদিকে সংস্কারকাঠামোর প্রথম পূর্ণ বছর, অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১২ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ, সংস্কার রাজস্ব আহরণে বাধা সৃষ্টি করেনি। বরং অচলাবস্থা তৈরি করেছিল আন্দোলন। আর সেই আন্দোলনে ইন্ধন কোথা থেকে এসেছিল, তা রেকর্ডেই আছে। আমরা সেই ভিডিও বক্তব্য শুনেছি, দেখেছি।’
তিনি লেখেন, ‘তিন. মাননীয় অর্থমন্ত্রী বলেছেন ‘আধাআধি করে চলে গেছে’। প্রশ্ন হলো, আধাআধি রাখল কে? এনবিআরের নিজস্ব প্রতিবেদনই বলছে, সংসদ কার্যকর হওয়ার পর অধ্যাদেশ দুটিকে আইনে রূপান্তর না করায় সেগুলো বিলুপ্ত বলে গণ্য হয়েছে। আইনে রূপান্তরের এখতিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের ছিল না, ছিল বর্তমান সংসদের। এরপর গত ২৮ এপ্রিল গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি চারটি বৈঠক করেছে, প্রতিবেদন আজও আসেনি। সুতরাং, সংস্কার অর্ধেক অবস্থায় ছিল না; একে অর্ধেক অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে।’
‘প্রশ্ন হলো, বিএনপি কেন অধ্যাদেশ দুটিকে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই আইনে রূপান্তর করেনি?’
তিনি লেখেন, ‘চার. সংস্কার নিজে থেকে করতে না চেয়ে বিদেশিদের চাপে সংস্কার কেন করতে হচ্ছে? উল্লেখ্য, রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়কে আলাদা রাখা কোনো পরীক্ষামূলক ধারণা নয়, ওইসিডিভুক্ত (উন্নত দেশের জোট) প্রায় সব দেশেই এবং অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশেই এটি বহু আগেই প্রতিষ্ঠিত রীতি।’
‘যুক্তরাজ্যে নীতি প্রণয়ন করে ট্রেজারি বিভাগ, আদায় করে এইচএমআরসি (হিজ ম্যাজেস্টিজ রেভিনিউ অ্যান্ড কাস্টমস)। যুক্তরাষ্ট্রে নীতি ট্রেজারির হাতে, আদায় আইআরএসের (ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিস)। দক্ষিণ আফ্রিকায় নীতি ন্যাশনাল ট্রেজারির, আদায় সার্সের (সাউথ আফ্রিকান রেভিনিউ সার্ভিস)।’
তিনি আরও লেখেন, ‘বাংলাদেশ সেই গুটিকয় দেশের একটি, যেখানে কর্মকর্তাদের মধ্যে যিনি করহার ও অব্যাহতি নির্ধারণ করেন, তিনিই আদায় করেন এবং তিনিই নিরীক্ষা করেন। এই স্বার্থের সংঘাতই ঘুষ, দর–কষাকষি ও রাজস্ব ‘লিকেজের’ সবচেয়ে বড় উৎস এবং তা টিকিয়ে রাখার আগ্রহ কোথা থেকে আসে, তা জাতীয় সংসদ ও বাংলাদেশের মানুষের জানার অধিকার আছে।’
‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এই বিভাজনের বিরোধিতা করা হয়েছে, সরকারে এসে একে বাতিল করা হয়েছে, আর এখন আইএমএফের (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) শর্ত ও ঋণের কিস্তি আটকে যাওয়ার পর মাননীয় অর্থমন্ত্রীই বলছেন, ‘এনবিআর দুই ভাগ হবে’।’
ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘প্রশ্নটি সহজ, নীতি ও রাজস্ব আদায় আলাদা করা ভালো না মন্দ? যদি ভালো হয়, বিরোধিতা কেন? যদি মন্দ হয়, বিদেশি ঋণদাতার শর্তে মেনে নেওয়া কেন? যে সংস্কার নিজেদের রাজনৈতিক প্রত্যয় থেকে আসে না, ঋণের কিস্তির প্রয়োজনে আসে, সেটি সংস্কার নয়; সেটি বাধ্যবাধকতা। আর নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায় একই হাতে রাখার আগ্রহ কার স্বার্থে, তা সবার জানার অধিকার আছে।’
‘এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই চলতি অর্থবছরে (২০২৬-২৭) ৬ লাখ কোটি টাকার লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, যা গত বছরের প্রকৃত আদায়ের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেশি। অথচ কেবল আয়কর বিভাগেই ১২ হাজার ৭৬৪টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৪ হাজার ৫৫২টি শূন্য, যা মোট পদের প্রায় ৩৬ শতাংশ। ই-টিআইএন, ই-রিটার্ন, ই-টিডিএস, ভ্যাট অনলাইন ও অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড চালু থাকলেও পরস্পর সংযুক্ত নয়। একজন করদাতার সম্পূর্ণ চিত্র এক জায়গায় দেখার ব্যবস্থাই নেই।’
এনসিপির এই নেতা লেখেন, ‘কর-জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। শুল্ক খাতেই ২৫ হাজার কোটি টাকার বকেয়া এবং গত অর্থবছরেও ৭৭ হাজার কোটি টাকার অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ খাতটিতে হাত দেওয়া হচ্ছে না।’
‘পাঁচ. সরকারের কাছে আমার তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন।’
‘১. মাননীয় অর্থমন্ত্রী যে বলেছেন ‘এনবিআর দুই ভাগ হবে’, সে আইন কোন তারিখে সংসদে উত্থাপিত হবে? ২. রাজস্ব আদায়ে ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কোন প্রশাসনিক সক্ষমতা-পরিকল্পনার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছে এবং জনবল ও ন্যাশনাল ইন্টার-অপারেবিলিটি দিয়ে সিস্টেম-সংযুক্তির সময়াবদ্ধ পথনকশা বা রোডম্যাপ সংসদে উপস্থাপন কবে হবে? ৩. গত ২৮ এপ্রিল গঠিত কমিটির প্রতিবেদন কবে প্রকাশিত হবে এবং তা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে আলোচনার জন্য উন্মুক্ত করা হবে কি না? জনগণ জানতে চায়, এই সরকার সংস্কার করছে সৎ রাজনৈতিক প্রত্যয় থেকে, নাকি কেবল ঋণের কিস্তির প্রয়োজনে, বিদেশিদের চাপে?’
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন