প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধের পর পশ্চিমাদের উদ্দেশে প্রতিরোধের বার্তা দিতে শনিবার, তথা গতকাল, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শহিদ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যানুষ্ঠানের সূচনায় তেহরানে লাখো মানুষের ঢল নেমেছে।
তেহরান থেকে এএফপির সংবাদদাতারা জানান, কালো পোশাক পরিহিত এবং শিয়া ইসলামে প্রতিশোধ ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত রক্তিম পতাকা হাতে শোকাহত মানুষ রাজধানী তেহরানের ধর্মীয় কমপ্লেক্স গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সমবেত হন।
১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের নেতৃত্ব দেওয়া আলি খামেনি পশ্চিমাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতার নীতি অনুসরণ করেছেন এবং দেশের অভ্যন্তরে ভিন্নমত কঠোরভাবে দমন করেছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিন ইসরাইলি হামলায় ৮৬ বছর বয়সে তিনি নিহত হন। ওই হামলায় তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য ও শীর্ষ কর্মকর্তারাও প্রাণ হারান।
খামেনির ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির এখনো কোনো প্রকাশ্য উপস্থিতি দেখা যায়নি। তাঁকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত করার পর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। তবে যুদ্ধে বেঁচে থাকা ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা শুক্রবার বিদেশি অতিথিদের অভ্যর্থনা জানান এবং তারা খামেনির কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে কমপ্লেক্সটি সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
তেহরানে আগামী কয়েক দিনে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। তাই শোকাহতদের স্বস্তি দিতে পানি ছিটানো হয়। নারী ও পুরুষকে পৃথকভাবে রাখা হয় এবং হাজারো মানুষ বিশাল কমপ্লেক্সটি পূর্ণ করে তোলে।
এএফপির প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, সামনের মঞ্চে খামেনি ও তাঁর পরিবারের আরও চার সদস্যের কফিন রাখা হয়েছে।
অনুষ্ঠানস্থলে ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগান ধ্বনিত হয়।
৩৮ বছর বয়সী ধর্মীয় নেতা মোহাম্মদ মিরসালেহি বলেন, ‘নেতা আমাদের সবার পিতার মতো ছিলেন। তাঁর চলে যাওয়ায় আমরা সবাই এতিম হয়ে গেছি। তাঁর মতো আর কেউ ছিলেন না। তিনি সত্যিই অনন্য ছিলেন।’
১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী হামিদরেজা শাবানি বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই উঠে দাঁড়াতে হবে এবং ইনশাআল্লাহ আমাদের নেতার রক্তের প্রতিশোধ নিতে হবে।’
কর্তৃপক্ষের ধারণা, রাজধানী তেহরানেই এসব কর্মসূচিতে এক কোটিরও বেশি মানুষ অংশ নেবেন।
তবে অনুষ্ঠান শুরুর আগে তেহরান ছিল তুলনামূলক শান্ত। সাধারণত যানজটে ভরা সড়কগুলো অনেকটা ফাঁকা ছিল। প্যারিসে অবস্থানরত এএফপির সাংবাদিকদের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় তারা রাজধানী ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
দীর্ঘ শেষকৃত্যানুষ্ঠান।
পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি প্রাথমিক সমঝোতা কার্যকর থাকায় বর্তমানে সংঘাত স্থগিত রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই প্রয়োজন হলে আবার যুদ্ধ শুরু করার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা খামেনির মৃত্যু ইরানে নতুন এক যুগের সূচনা করছে, যা অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন।
দেশটির কর্তৃপক্ষের মতে, এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সরকারের প্রতি জনসমর্থনেরও একটি পরীক্ষা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষ নিহত হওয়ার অভিযোগে সরকার আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, খামেনির মরদেহ তিন দিন তেহরানে রাখা হবে। এরপর মঙ্গলবার ধর্মীয় নগরী কোমে নেওয়া হবে। বুধবার মরদেহ নেওয়া হবে প্রতিবেশী ইরাকে এবং বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নিজ শহর মাশহাদে তাঁর দাফন সম্পন্ন হবে।
মাশহাদে অবস্থিত ইমাম রেজার মাজার-এ তাঁকে সমাহিত করা হবে। একই কবরস্থানে তাঁর নাতনি, জামাতা, কন্যা এবং মোজতবা খামেনির স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ আদেলকেও দাফন করা হবে। তারা সবাই ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় নিহত হন।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মদি গোলপায়গানির ছোট কফিনটিও অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে প্রদর্শন করা হয়।
‘প্রতিশোধের আহ্বান’
শুক্রবার জীবিত থাকা শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে শোক প্রকাশের পাশাপাশি ঐক্যের বার্তা দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফকে অশ্রুসজল দেখা যায়। একই সময়ে হামলায় নিহত পূর্বসূরির স্থলাভিষিক্ত হয়ে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস-এর প্রধান হওয়া আহমদ বাহিদি নতুন দায়িত্বে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে উপস্থিত হন।
কালিবাফ বলেন, ‘প্রতিশোধের জন্য জাতির আহ্বান সমগ্র বিশ্বের কানে পৌঁছাতে হবে।’ তিনি ইরানিদের ব্যাপক সংখ্যায় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
আগামী বেশ কয়েকটি দিনে মোজতবা খামেনির কোনো প্রকাশ্য উপস্থিতি দেখা যায় কি না, সেদিকে নিবিড় নজর থাকবে। তিনি এখন পর্যন্ত কেবল লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে যোগাযোগ করেছেন। একই হামলায় তিনি আহত হয়েছিলেন বলে জানা গেলেও তাঁর আঘাতের মাত্রা কখনো স্পষ্ট করা হয়নি।
অনুষ্ঠান ঘিরে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বহু সড়ক বন্ধ রাখা হয়েছে এবং আকাশসীমাও বন্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনি-র দাফনের পর এটিই ইরানের সবচেয়ে বড় জনসমাগমের অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে।
অতীতে এ ধরনের অনুষ্ঠানে পদদলিত হওয়ার ঘটনা ঘটায় এবার সে ঝুঁকি এড়াতে কর্তৃপক্ষ বিশেষ সতর্কতা নিয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও নিরাপদে অংশগ্রহণের নির্দেশনা প্রচার করা হচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন