প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: সংগৃহীত
একসময় শিক্ষকতা করতেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পাশাপাশি মঞ্চে উঠতেন তিনি। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও নানা খেলাধুলায় যুক্ত ছিলেন। ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে ছিলেন সক্রিয়। এরপর তিনি পৌরসভার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, দলের মুখপাত্র এবং শেষ পর্যন্ত বিএনপি মহাসচিব হয়েছেন।
জীবনের প্রতিটি অধ্যায় পেরিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছেন আরও বড় এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের সামনে। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ক্ষমতাসীন বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি। আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এখনও সম্পন্ন হয়নি, তবে চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে এবং রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়। কারণ, তিনি ক্ষমতাসীন দল বিএনপির একমাত্র মনোনীত প্রার্থী।
মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথে এমন খবরে জেলার মানুষ খুব খুশি। এ খুশির আনন্দ শুধু দলীয়ভাবে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সাধারণ মানুষের মাঝেও ছড়িয়ে পড়েছে। মহল্লায় মহল্লায় মিষ্টি বিতরণ করা হচ্ছে জেলাজুড়ে। ধনী, গরীব, শিশু, যুবক, বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের মধ্যেই উল্লাস আর আনন্দ দেখা যাচ্ছে।
নাট্যমঞ্চ থেকে রাজনীতির মঞ্চে মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের গল্প শুধুমাত্র দলীয় পদ-পদবি অথবা নির্বাচনী রাজনীতির নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে সংস্কৃতি ও নাট্যচর্চা, শিক্ষকতা এবং ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতা।
ছাত্রজীবনে তিনি নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নাট্যমঞ্চে অভিনয় করেছেন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। সেই সময়ের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তার ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পরে রাজনীতির কঠিন বাস্তবতাতেও তার মধ্যে সংস্কৃতিমনস্কতার ছাপ থেকে যায়। এছাড়া ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও মির্জা ফখরুলের অনেক নাম রয়েছে।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী ও একাধিকবারের সংসদ সদস্য। ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠার পাশাপাশি তিনি শৈশব থেকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান।
ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। সেখান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রইউনিয়নের সদস্য হিসেবে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময় সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নাট্যমঞ্চ আর রাজনীতির উত্তাল রাস্তা—দুই ভিন্ন জগতের অভিজ্ঞতা নিয়ে তরুণ মির্জা ফখরুল গড়ে ওঠেন।
শিক্ষা জীবন শেষ করে দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা করেন মির্জা ফখরুল। তিনি ঢাকা কলেজসহ কয়েকটি সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস. এ. বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৬ সালে শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নিয়ে ১৯৮৭ সালে শিক্ষা বিভাগের অডিট সেকশনের পরিচালক হয়ে চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যুক্ত হন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এর পরে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন।
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হলেও মির্জা ফখরুল থেমে যাননি। ধারাবাহিকভাবে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আসনটি হারালেও জাতীয় রাজনীতিতে তার ভূমিকা থেমে থাকেনি। ২০০৯ সালে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি দলের অন্যতম প্রধান মুখপাত্র হিসেবে রাজপথ ও গণমাধ্যমে সক্রিয় হতে থাকেন।
তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি দলকে সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ঠাকুরগাঁও রিভারভিউ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মুবিন রতন সমকালকে বলেন, ‘১৯৮৭ সালে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের ছাত্র ছিলাম। মির্জা ফখরুল ইসলাম স্যার অর্থনীতি বিষয়ে ক্লাশ নিতেন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। অনেক মনোযোগ দিয়ে পড়াতেন। স্যারের ক্লাসে পড়লে সে বিষয়ে আর বাড়িতে পড়তে হতো না। তিনি অত্যন্ত সৎ ও ভদ্র মানুষ ছিলেন। সহজে কারও ওপর রাগ করতেন না।’
ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে জানান, ‘আলমগীরের সঙ্গে শৈশব-কৈশোর একসঙ্গে কেটেছে। সে অনেক মেধাবী ছিল। শিক্ষকতার পাশাপাশি নাটকের মঞ্চে অভিনয় করত। খেলাধুলার সংগঠক হিসেবে কাজ করত। রাজনীতিতেও বেশ সক্রিয় ছিল ছোটবেলা থেকে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আজ আলমগীর বঙ্গভবনের বাসিন্দা হতে চলেছে; বুকটা গর্বে ভরে যাচ্ছে। সে যে এমন জায়গায় পৌঁছাবে এটা কিন্তু তার চালচলনে বোঝা যেত। তার মাঝে কোনো গৌরব ছিল না। ধনী-গরীবের ভেদাভেদ ছিল না। ধর্মীয় বিষয়ে কোনো বিভক্তি ছিল না। পূজার সময় আমাদের বাড়িতে আসত। এক কথায় আলমগীরকে না খাইয়ে আমরাও খেতাম না। আলমগীর আগে ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ থাকলেও সে দেশের সর্বোচ্চ স্থানে যেতে চলেছে। তার জন্য শুভকামনা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন