প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেছেন যে, বিরোধীদলকে সম্মান প্রদানে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, গতকাল সোমবার ওসমানী উদ্যানে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির এবং সেক্রেটারি জেনারেলকে দাওয়াত কার্ড পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু অনুষ্ঠানের সূচিতে প্রধানমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ অন্যান্য অতিথিদের নাম থাকলেও রুলস অব প্রেসিডেন্ট অনুযায়ী পূর্ণ মন্ত্রী পদমর্যাদার বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সরকার তার প্রাপ্য সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, বিরোধী দলকে ছোট করার জন্য এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তাই তিনি সেখানে যাননি বলে যে অভিযোগ করা হয়েছে, সেটি আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। এটি অন্যায় এবং বিরোধী দলের প্রতি অবিচার করা হয়েছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব মন্তব্য করেন। এই প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়েছে সমসাময়িক সাতটি বিষয়ে দলীয় অবস্থান তুলে ধরার জন্য।
তিনি বলেন, সরকারের অভ্যন্তরে গত সাত আট মাসে কি ঘটেছে, তা আমাদের জানা নেই। তবে তাদের কথাবার্তা ও সিদ্ধান্তে সমন্বয়হীনতা, বৈপরিত্য এবং দ্বিচারিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারের এই হীন অপচেষ্টা বর্তমানে হাস্যকরভাবে উপভোগ করছে জাতি। সাত আট মাস না যেতেই নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য, গ্যাস, তেল, বিদ্যুৎ, কেরোসিন, অকটেন ও ডিজেলের দাম চার-পাঁচবার বাড়ানো হয়েছে। এই কয়েক মাসে তিনজন মন্ত্রী ও একজন এমপি বিদায় নিয়েছেন, অথচ সামনে আরো সাড়ে চার বছর রয়েছে। সরকারের মধ্যে এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও অস্থিরতা চলছে, ফলে প্রধানমন্ত্রী, তার মন্ত্রীপরিষদের সদস্য এবং অনেক এমপি অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছেন। এ কারণে জামায়াতের পক্ষ থেকে এই অসংলগ্ন কথাবার্তার ব্যাপারে আমাদের দলীয় অবস্থান তুলে ধরতে হচ্ছে।
জামায়াতকে জুলাইবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার প্রতিবাদ জানিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশের জনগণ, জুলাইযোদ্ধা, জুলাই শহীদ পরিবারসহ সবাই সাক্ষী- জামায়াত ও বিরোধীদল জুলাইকে ধারণ করে। তিনি বলেন, "মানুষ তার দুর্বলতা, ব্যর্থতা, অকৃতজ্ঞতা ঢাকবার জন্য কথা বলে, তারও একটা মাত্রা থাকে। কিন্তু বিরোধীদল জুলাইকে ধারণ করে না- এত হাস্যস্কর অসত্য তথ্য দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে উপস্থাপন করেছেন, আমরা এটার নিন্দা জানাই।"
তিনি আরো বলেন, জামায়াতসহ ১১ দলীয় ঐক্য জুলাইকে ধারণ করে, গণভোটের গণরায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম করছে। বিএনপি জুলাইকে ধারণ করে না, কারণ তারা গণভোটকে অস্বীকার করেছে এবং বাতিল করেছে। জামায়াত জুলাইকে ধারণ করে, কিন্তু সরকার জুলাই সনদকে ধারণ করছে না।
তিনি বলেন, "যদি সরকার জুলাই সনদকে ধারণ করতেন, তাহলে জুলাই সনদে যে সমস্ত ব্যাপারে আমরা একমত হয়েছি- দলীয়করণ, দুর্নীতি, ভিন্ন মতের বিরুদ্ধে দমননীতি- এগুলো থেকে পরিহার করা উচিত। বিএনপি সেদিকেই হাঁটছে, অর্থাৎ তারা জুলাই সনদকে ধারণ করছে না।"
তিনি অভিযোগ করেন যে, সরকার সব সাংবিধানিক, সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ করছে। সরকার ফ্যাসিবাদী কায়দায় রাষ্ট্র কাঠামো নির্মাণের জন্য সংবিধানকে ফ্যাসিবাদী ফ্রেমে রাখছে। তারা জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার না করে সংশোধনের নামে এগিয়ে যাচ্ছে। গোলাম পরওয়ার বলেন, "এরকম সংশোধিত গঠনতন্ত্রে যে রাষ্ট্র আসবে, যে প্রধানমন্ত্রী হবে, সে আরেকটা হাসিনাতে ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠবে। আমরা সেই পথকে থামাতে চেয়েছি।"
সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করার যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তার নিন্দা জানিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার তিনটি জিনিসকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলছে। রাষ্ট্র, সরকার ও সরকারি দলের মধ্যে যে পার্থক্য আছে, তা তারা বুঝতে পারছেন না।
তিনি বলেন, বিরোধী দলের দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের সমস্ত গণবিরোধী কাজের বিরোধিতা করা। "এটা জুলাই শহীদের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে, বলবেন? আপনি তো সরকার ও সরকারি দলকে এক করে ফেলেছেন। এজন্য নিজেদের দলীয়করণ, ব্যর্থতা, দুর্নীতি ঢাকার জন্য জুজুর ভয় দেখিয়ে সব দায় বিরোধী দলের ওপরে চাপাবার চেষ্টা করা হচ্ছে।"
তিনি বলেন, "আমরা কখনো এই ফ্যাসিস্টকে আসার সুযোগ করে দিচ্ছি না। বরং আপনারা এত বড় বিরোধী দলের সমস্ত আন্দোলনকে উপেক্ষা করার মধ্য দিয়ে যে অরজকতা-অস্থিতিশীলতা তৈরি করছেন, এই পথ দিয়ে বরং আপনারা ইচ্ছা করে আওয়ামী লীগকে ঢুকার পথ করে দিচ্ছেন।"
বিএনপি মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্য প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার বলেন, তিনি জানতে চেয়েছেন- ফ্যাসিবাদের পথ কোনটা? "আপনি সাত মাসের মধ্যেই ফ্যাসিস্ট ভুলে গেলেন? আপনি ফ্যাসিস্ট চিনতে গেলে জনগণের কাছে ফেরত যান। আপনার দলীয় কর্মীদের কাছে ফেরত যান, আপনার যেসব দলের যারা ধান খেতে পালাইছিল, ওদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন এই ফ্যাসিস্ট কাকে বলে, ওরা বলতে পারবে।"
তিনি বলেন, "চাদাবাজি, ধর্ষণ, খুন ও লুটপাটের পথই হল ফ্যাসিবাদের পথ। সরকারের সব পদে নিজে দলের লোক বসানোই হচ্ছে ফ্যাসিবাদের পথ। জনগণকে ভুল বুঝিয়ে ওয়াদা ভঙ্গ করে বিচারিতার পথ অবলম্বন করে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করে গণভোটের রায় উপেক্ষ করাই হচ্ছে ফ্যাসিবাদের পথ। বিরোধী দলের নেতা এসব পথের কথাই বলেছেন।"
তিনি রাজশাহীতে জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপির এলাকায় ওয়াজ মাহফিল করতে না দেয়ার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। এছাড়া ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আলিম-ফাজিল মাদ্রাসাগুলোর গভর্নিং বডি, ম্যানেজিং কমিটিকে ভেঙে দেয়ার বিষয়ে প্রজ্ঞাপন প্রসঙ্গে বলেন, সরকার ফ্যাসিবাদী কায়দায় সরকারি নিজস্ব চিন্তার লোকদের দিয়ে মাদ্রাসাগুলোকে নিয়ন্ত্রণে নিতে চাচ্ছে। তিনি রিজভীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "এটা কোন রাস্তা? এই পথে কিন্তু শেখ হাসিনা হাঁটছিল। হাঁটতে হাঁটতে দিল্লির দিকে চলে গেছে পথ ভুলে।"
তিনি বিরোধীদলীয় এমপিদের বরাদ্দ না দেয়ার প্রতিবাদ জানান। ভবিষ্যতে যেন জামায়াত আমিরকে নিয়ে কোন অসত্য তথ্য বক্তব্য দেওয়া না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গোলাম পরওয়ার বলেন, সৌদিতে দুইজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা রয়েছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের সঙ্গে কওমি-আলিয়া এসব ওলামায়ে কেরামের মধ্যে বাংলাদেশে কোন বিরোধ নেই। এই বিরোধকে আমরা মানি না।
প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, মাওলানা আব্দুল হালিম, এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ ও ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন