প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ কক্সবাজারের সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত ও অবস্থানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধিনিষেধে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। নতুন সিদ্ধান্তের আওতায় পর্যটকদের রাত্রিযাপন ও ভ্রমণের সময়সীমা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দ্বীপের পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা এবং পর্যটন ব্যবসার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে নতুন নীতিমালায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের মাধ্যমে জানা গেছে, সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা, পরিবেশবিদ, পর্যটন ব্যবসায়ী, ট্যুর অপারেটরসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে এ সংক্রান্ত নীতিমালা চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, দ্বীপের পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার লক্ষ্যে পর্যটকদের যাতায়াত ও অবস্থানে একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। পরবর্তী ব্যবস্থায় নভেম্বর মাসে পর্যটকদের দিনের বেলায় ভ্রমণের সুযোগ রাখা হলেও রাত্রিযাপনের অনুমতি ছিল না। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে সীমিতসংখ্যক পর্যটক রাত্রিযাপন করতে পারতেন। সরকারি পর্যটন তথ্যেও সেন্টমার্টিনে পর্যটন নিয়ন্ত্রণের এই সময়ভিত্তিক ব্যবস্থার উল্লেখ রয়েছে।
তবে এ বিধিনিষেধের কারণে দ্বীপের পর্যটননির্ভর ব্যবসা ও স্থানীয় মানুষের আয়-রোজগারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে দাবি করেছেন সেখানকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। তাদের ভাষ্য, পর্যটক কমে যাওয়ায় হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, নৌযান, পর্যটন পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে জীবিকার সংকটে কিছু বাসিন্দার মধ্যে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতাও দেখা দিয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
সেন্টমার্টিন হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি এম এ আবদুর রহিম জিহাদীর তথ্যমতে, দ্বীপে বর্তমানে প্রায় ১৫০টি আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এসব আবাসন প্রতিষ্ঠানে প্রায় পাঁচ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। পর্যটন মৌসুমে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমনকে কেন্দ্র করে দ্বীপের অর্থনীতি মূলত পর্যটননির্ভর হয়ে উঠেছে।
পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, সেন্টমার্টিনে যাতায়াতে দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়। কক্সবাজার থেকে টেকনাফ এবং সেখান থেকে নৌপথে দ্বীপে যেতে পর্যটকদের উল্লেখযোগ্য সময় লাগে। ফলে কয়েক ঘণ্টার জন্য দ্বীপে গিয়ে একই দিনে ফিরে আসার বাধ্যবাধকতা পর্যটকদের নির উৎসাহিত করছে। সরকারি পর্যটন তথ্যেও টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনের নৌযাত্রায় প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগার কথা উল্লেখ রয়েছে।
পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করে একজন পর্যটক সেন্টমার্টিনে গিয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করে আবার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ফিরে আসা বাস্তবসম্মত নয়। তাই পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি পর্যটকদের রাত্রিযাপনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি সরকার সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।
বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ রাফিউজ্জামানও রাত্রিযাপনের বিধিনিষেধে পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তার মতে, কক্সবাজার থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য সেন্টমার্টিন যাওয়ার সুযোগ পর্যটকদের আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। এতে করে পর্যটনসংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা ও কক্সবাজার-টেকনাফের পর্যটনসংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের অনেকে আগের বিধিনিষেধের সমালোচনা করেছেন। তাদের অভিযোগ, পরিবেশ সংরক্ষণের নামে নেওয়া সিদ্ধান্তে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও পর্যটন ব্যবসার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তারা আগের নীতিমালার কারণে সেন্টমার্টিনের পর্যটন খাতে যে ক্ষতি হয়েছে, তার পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন।
কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের ভূমিকারও সমালোচনা করেন। তাদের অভিযোগ, তার সময় নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তের কারণে সেন্টমার্টিনসহ কক্সবাজারের পর্যটন ও উন্নয়ন কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা এ বিষয়ে তদন্ত করে দায় নির্ধারণ ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য ও প্রবালপ্রাচীর রক্ষা করতে পর্যটন নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। সরকারি নথিতেও দ্বীপটিকে প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ব্যবস্থা ও মাস্টার প্ল্যানের উদ্যোগের কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন নীতিমালায় একদিকে পর্যটকের সংখ্যা ও পরিবেশগত চাপ নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিক ব্যবহার রোধ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে দ্বীপের প্রায় ৮-১০ হাজার বাসিন্দার জীবন-জীবিকা এবং পর্যটননির্ভর অর্থনীতির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। সরকারের নতুন নীতিমালায় এই দুই দিকের মধ্যে সমন্বয় কতটা করা যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন