প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ফ্রান্সের শত শত সুপারশপে সাইবার হামলার মাধ্যমে শীতলীকরণ যন্ত্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করেছে হ্যাকাররা। এই হামলার ফলে ফ্রিজ ও হিমায়কের তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এর ফলে বিপুল পরিমাণ তাজা ও হিমায়িত খাবার নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু দোকানে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটেছে। দেশটির বড় বড় খাদ্যপণ্যের বিপণিবিতানে এই ধরনের হামলাকে নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সোমবার (১২ অক্টোবর) ফ্রান্সের একাধিক বড় বিপণিবিতান কর্তৃপক্ষ সাইবার হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে দেশটির জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা। একই সঙ্গে ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোতেও এই ধরনের হামলা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের ইন্টারমার্শে ও এর সহযোগী ব্র্যান্ড নেটোর অন্তত ৩০০টি দোকান এই হামলার শিকার হয়েছে। কো-অপারেটিভ ইউর এর শতাধিক বিপণিবিতানেও প্রভাব পড়েছে।
এছাড়া ক্যারেফুরের ৮০টি সুপারশপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোনোপ্রির প্রায় ৪৯০টি দোকানের মধ্যে ৫ শতাংশের মতো এই হামলার শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ই লেক্লেরকের কিছু দোকানেও হামলা হয়েছে।
প্যারিসের সরকারি কৌঁসুলির দপ্তর জানিয়েছে, ফ্রান্সের একাধিক বড় খাদ্যপণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ইন্টারনেট-সংযুক্ত শীতলীকরণ যন্ত্রে এই হামলা সংঘটিত হয়েছে। এতে খাবার নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কিছু স্থানে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হ্যাকাররা দূর থেকে শীতলীকরণ ব্যবস্থার বরফ গলানোর প্রক্রিয়া সক্রিয় করে দেয়। এর ফলে বিভিন্ন দোকানের ফ্রিজ ও হিমায়কের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। ফলে তাজা খাবার ও হিমায়িত পণ্য নষ্ট হয়ে যায়।
বড় সুপারশপে সাধারণত ফ্রিজ ও হিমায়কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয় একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে। ইন্টারনেটের সাহায্যে এসব যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় প্রবেশ করা সম্ভব হওয়ায় দূর থেকেই তাপমাত্রা পরিবর্তন করা যায়। তবে এই সুবিধাই সাইবার হামলার ঝুঁকি তৈরি করে।
ইন্টারমার্শের প্রধান নির্বাহী থিয়েরি কোটিয়ার্দ ফরাসি সংবাদমাধ্যম বিএফএম টিভিকে জানিয়েছেন, দেশজুড়ে এক দিনেই কয়েক কোটি ইউরোর ক্ষতি হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলোকে তাজা ও হিমায়িত খাবারের সব পণ্য ফেলে দিতে হতে পারে বলেও জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটি।
কো-অপারেটিভ ইউর প্রধান নির্বাহী দমিনিক শেলশে বলেন, রোববার (১১ অক্টোবর) রাত থেকেই তাদের শীতলীকরণ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে। তাজা খাবার সংরক্ষণ ও মানুষের খাদ্য সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতিকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো গুরুতর ও অগ্রহণযোগ্য।
ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু দেশটির জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাকে হামলার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠান ড্যানফসের তৈরি একটি সফটওয়্যারের দুর্বলতা শনাক্ত করা হয়েছে।
ড্যানফস জানিয়েছে, ফ্রান্সে তাদের শীতলীকরণ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের কিছু যন্ত্রে সমস্যা হওয়ার বিষয়টি তারা জানে। ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রগুলোতে সফটওয়্যারের পুরোনো সংস্করণ ব্যবহার করা হচ্ছিল। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের সফটওয়্যার হালনাগাদ রাখা এবং পুরোনো যন্ত্র বদলে ফেলার পরামর্শ দিয়ে আসছে।
গত ৯ আগস্ট সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্ল্যারোটি ড্যানফসের কয়েকটি ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে একটি গবেষণা প্রকাশ করে। ওই দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে পরিচয় যাচাইয়ের ধাপ এড়িয়ে অননুমোদিতভাবে ব্যবস্থায় প্রবেশ করা সম্ভব হতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে এই দুর্বলতাই হামলার একমাত্র কারণ কি না, তা তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
সাইবার হুমকি বিশ্লেষক ফেলিক্স এইমের দাবি, স্পেন, পর্তুগাল, পোল্যান্ড, জার্মানি ও বেলজিয়ামেও এ ধরনের হামলার প্রভাব পড়েছে। ফ্রান্সের খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ড্যানফসের কাছে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কিছু দোকানে ইতোমধ্যে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
ফরাসি কর্তৃপক্ষ ইউরোপের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে। একই সঙ্গে ফ্রান্সের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোও ঝুঁকিতে রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক স্টিভেন লাশাঁসের মতে, এমন হামলা একেবারে নতুন নয়, তবে এত বড় পরিসরে ঘটনার নজির বিরল। ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত কোনো যন্ত্রে নিরাপত্তার দুর্বলতা থাকলে হামলাকারীরা দূর থেকে সেটিতে প্রবেশ করে তার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
তিনি এ ঘটনাকে বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তার জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার আশঙ্কা, যথাযথ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা আরও বাড়তে পারে।
সুপারশপে খাবার নষ্ট করে আর্থিক ক্ষতি ঘটানোই শেষ কথা নয়। একই ধরনের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা কিংবা হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতিতে হামলা চালানো হলে ক্ষতির মাত্রা আরও ভয়াবহ হতে পারে। তাই ইন্টারনেট-সংযুক্ত যন্ত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নয়, জননিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
সূত্র: আল জাজিরা
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন