প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় কৃষকরা আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। জমির বিভিন্ন স্থানে ফুলকপি, বাঁধাকপি ও অন্যান্য সবজির চারা রোপণ করা হচ্ছে, আবার কোথাও গাছের পরিচর্যা চলছে। কিছু জমিতে কৃষকরা আগাম উৎপাদিত সবজি বাজারে বিক্রি করছেন। গত মৌসুমে আগাম সবজি চাষ করে তারা ভালো লাভ পেয়েছিলেন, তাই এবারের মৌসুমেও তারা আশাবাদী। শীতের শুরুতেই সবজি বিক্রি করে অধিক মুনাফার প্রত্যাশা করছেন কৃষকরা।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন সবজি চাষের কর্মযজ্ঞ চলছে। ফুকুরহাটি, জান্না, তিল্লী, দরগ্রাম ও চর তিল্লীসহ বিভিন্ন স্থানে ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, শিম, করলা, পটল, লাউ, মুলা, টমেটো, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, গাজর ও নানা ধরনের শাকের আবাদ হচ্ছে। কৃষকরা এসব সবজি চাষ করে একদিকে পরিবারের চাহিদা পূরণ করছেন, অন্যদিকে উৎপাদিত সবজি বিক্রি করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
সাটুরিয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা ৯৫০ হেক্টর জমিতে নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে ইতোমধ্যে ৯৯১ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজির আবাদ সম্পন্ন হয়েছে। কৃষকদের আগ্রহ ও অনুকূল বাজার পরিস্থিতির কারণে আবাদি জমির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর উপজেলায় আগাম শীতকালীন সবজির ব্যাপক আবাদ হয়েছিল। মৌসুমের শুরুতে ভালো দাম পাওয়ায় অনেক কৃষক লাভবান হন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবারে শীতের পুরোপুরি আগমনের আগেই আগাম জাতের সবজি চাষে ঝুঁকছেন তারা। ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, বেগুন, মুলা, পালংশাক ও ধনেপাতা সহ বিভিন্ন সবজির আবাদ করছেন কৃষকরা।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে সবজির চাষাবাদ চলছে। কোথাও কৃষকরা জমি প্রস্তুত করে চারা রোপণ করছেন, কোথাও পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। আবার কোনো জমিতে উৎপাদিত সবজি তুলে বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। অনেক ক্ষেত্রে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা সরাসরি কৃষকের ক্ষেত থেকে সবজি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে কৃষকদের পরিবহন খরচ ও বাজারে পণ্য নিয়ে যাওয়ার ঝামেলা কমছে।
কৃষকদের ভাষ্য, শীতকালীন সবজির চাহিদা সারা মৌসুমেই থাকে। তবে মৌসুমের শুরুতে সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকায় আগাম সবজির দাম ভালো পাওয়া যায়। এ কারণে আগাম চাষে আগ্রহ বাড়ছে। অন্যান্য ফসলের তুলনায় অনেক সবজি অল্প সময়ে বিক্রির উপযোগী হয়। ফলে দ্রুত পুঁজি ফেরত পাওয়ার পাশাপাশি লাভের সুযোগও তৈরি হয়।
উপজেলার ফুকুরহাটি এলাকার কৃষক নায়েব আলী (৫৫) জানান, তিনি ৬০ শতাংশ জমিতে ফুলকপির আবাদ করেছেন। আগাম জাতের ফুলকপি চাষ করে তিনি ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন।
নায়েব আলী বলেন, ‘সবজি চাষ করে আমাদের সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। এখন আর সবজি বিক্রির জন্য হাটবাজারে যেতে হয় না। পাইকাররা ক্ষেত থেকেই সবজি কিনে নিয়ে যান। এতে সময় ও খরচ দুটোই কম লাগে। ভালো দাম পেলে কৃষকের লাভও বেশি হয়।’
তিনি আরও জানান, ফুকুরহাটি ইউনিয়নে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির আবাদ হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এসব সবজি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা।
উপজেলার দরগ্রাম এলাকার রৌহা গ্রামের কৃষক নয়া মিয়া (৫৫) জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ১৫ শতাংশ জমিতে বেগুনের আবাদ করেছেন। এ পর্যন্ত দুই দফায় প্রায় ছয় মণ বেগুন তুলে আড়তে বিক্রি করেছেন। প্রতি মণ বেগুনের দাম পেয়েছেন ১ হাজার ৭৫০ টাকা। জমিতে আরও তিন থেকে চার দফা বেগুন তোলার সম্ভাবনা রয়েছে।
নয়া মিয়া বলেন, ‘অন্য ফসলের তুলনায় সবজি চাষে লাভ বেশি হওয়ায় আমি সবজি আবাদ করছি। এখন ঢাকার পাইকাররা জমি থেকেই সবজি কিনে নিয়ে যান। ফলে সবজি বাজারে নেওয়া ও বিক্রি করার বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয় না। এতে আমাদের সময় ও খরচ দুটোই বাঁচে।’
চর তিল্লী গ্রামের কৃষক আতাউর হোসেন (৪০) জানান, তিনি ৩০ শতাংশ জমিতে করলার আবাদ করেছেন। তার মতে, তুলনামূলক কম জমি ও পুঁজি দিয়েও সবজি চাষ শুরু করা যায়। অল্প সময়ের মধ্যে অনেক সবজি বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে। এতে নিয়মিত আয় করার সুযোগ তৈরি হয়।
আতাউর হোসেন বলেন, ‘সবজি চাষে খুব বেশি জমির প্রয়োজন হয় না। তুলনামূলকভাবে মূলধনও কম লাগে। অল্প সময়ের মধ্যেই সবজি বিক্রি করা যায়। পাশাপাশি পরিবারের চাহিদাও মেটানো সম্ভব। চলতি মৌসুমে সবজির দামও ভালো। সব মিলিয়ে আমরা সবজি চাষকে লাভজনক মনে করছি।’
স্থানীয় কৃষকদের মতে, ক্ষেত থেকে সরাসরি পাইকারদের কাছে সবজি বিক্রির সুযোগ তাদের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করেছে। এতে বাজারে পণ্য পরিবহনের খরচ, সময় ও শ্রম কম লাগছে। তবে উৎপাদন খরচ, আবহাওয়া এবং বাজারদরের ওঠানামা তাদের লাভের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সাটুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. তানিয়া তাবাসসুম বলেন, ‘সাটুরিয়া সবজি চাষের জন্য একটি পরিচিত উপজেলা। এখানে ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুনসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে চাষ হচ্ছে। আগাম জাতের সবজি উৎপাদনের ফলে একদিকে দেশের সবজির চাহিদা পূরণে অবদান রাখা সম্ভব হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষকরাও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, সবজির উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি কৃষি বিভাগ প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। আগাম জাতের সবজি চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন