প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মালয়েশিয়া উপকূলের বিশাল নোঙর এলাকাটি বর্তমানে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেল বিক্রির প্রধান বাজার হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।
গত শনিবার (২৫ জুলাই) ইরানের তেলবাহী জাহাজ ‘হিউম্যানিটি’ মালাক্কা প্রণালি ও সিঙ্গাপুরের উপকণ্ঠে যুক্ত হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে মালয়েশিয়া উপকূলের দিকে অগ্রসর হওয়ার পরে হঠাৎ করেই এর স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়।
স্যাটেলাইট ট্র্যাকিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৩৩০ মিটার দীর্ঘ অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজটি মালয়েশিয়ার ‘ইস্টার্ন আউটার পোর্ট লিমিটস (ইওপিএল)’ পৌঁছেছে। এটি দক্ষিণ চীন সাগরের ১,২০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এবং উপকূল থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
সামুদ্রিক নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাগরে অপেক্ষমাণ মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে অন্য জাহাজে তেল খালাস করার প্রস্তুতি নিতেই সম্ভবত জাহাজটি ট্র্যাকিংয়ের বাইরে গিয়ে ‘ডার্ক’ হয়ে গেছে। ইউএস-চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশনের তথ্যমতে, এই তেলের চূড়ান্ত গন্তব্য সম্ভবত চীন। ঐতিহাসিকভাবে, ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই চীন গ্রহণ করে।
বিশ্লেষকরা জানান, দীর্ঘকাল ধরে ইওপিএল এলাকার তেল কেনার একটি অনানুষ্ঠানিক বাজার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে ইরান, রাশিয়া এবং ভেনিজুয়েলার নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত তেল বিক্রি হচ্ছে। স্যাটেলাইট ডেটা বলছে, ইরানকে লক্ষ করে মার্কিন-ইসরাইলের পাঁচ মাসব্যাপী যুদ্ধ ও ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ সত্ত্বেও এই কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মেরিটাইম সিকিউরিটি মনিটরিং প্রজেক্ট সিলাইটের পরিচালক রে পাওয়েল আলজাজিরাকে জানান, এ বছরের শুরু থেকে তিনি এমন ৬২টি জাহাজ পর্যবেক্ষণ করেছেন, যেগুলো উপসাগরীয় অঞ্চল, ইওপিএল, হংকং এবং উত্তর চীনের মধ্যে চলাচলের সময় ভুয়া বা বাতিল হয়ে যাওয়া পরিচয় ব্যবহার করেছে। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক এরিকা ডাউন্স জানান, এসব জাহাজ মূলত মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি নেটওয়ার্কের অংশ, যারা চীনের স্বাধীন ‘টিপট’ বা ছোট তেল শোধনাগারগুলোতে ইরানের তেল বিক্রিতে সহায়তা করে।
এরিকা আরও বলেন, চীনে যাওয়া অপরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক জলসীমায় এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে স্থানান্তর করা হয়। তেলের উৎস গোপন রাখতে এর আগে এই প্রক্রিয়া একাধিকবার হতে পারে।
চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বড় কোম্পানিগুলোর (যেমন- সিএনপিসি, সিনোপেক ও সিএনওওসি) তুলনায় এই ছোট শোধনাগারগুলো মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার আওতার বাইরে থাকে। তাই তারা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানের তেল কম দামে কেনার ক্ষেত্রে আগ্রহী।
শান্ত জলসীমা ও আইনি ফাঁকফোকর
ইয়োকোসুকা কাউন্সিল অন এশিয়া-প্যাসিফিক স্টাডিজের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কর্মসূচির পরিচালক ও মেরিটাইম নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ চার্লি ব্রাউন বলেন, মালয়েশিয়ার ইওপিএল সংলগ্ন নোঙর এলাকাটি পূর্বের মতো ব্যস্ত রয়েছে।
তিনি বলেন, যুদ্ধের আগে এবং সংঘাতের প্রতিটি পর্যায়েই সেখানে নোঙর করা এবং জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের মতো নানা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া দেখা গেছে।
হংকংয়ের সমতুল্য আয়তনের ইওপিএল এলাকাটির সুবিধা রয়েছে এর শান্ত জলসীমা, যা সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার সরবরাহকারীদের কাছে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট কাছাকাছি। আবার এটি এমন দূরত্বে অবস্থিত যা ঐতিহাসিকভাবে এলাকাটিকে আইনিভাবে একটি ধূসর অথবা অস্পষ্ট অঞ্চলে পরিণত করেছে। এলাকাটি মালয়েশিয়ার আঞ্চলিক জলসীমার বাইরে হলেও এর এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের আওতাধীন। তবে এই অঞ্চলটি সমুদ্রে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার চেয়ে মাছ ধরার অধিকার ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের বিষয়গুলোর প্রতি বেশি গুরুত্ব দেয়। মালয়েশিয়ার মেরিটাইম এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি এর আগে বলেছে যে, দুর্গম অবস্থান ও অধিক্ষেত্রগত সীমাবদ্ধতার কারণে ওই এলাকায় টহল করা বেশ কঠিন।
তবে কুয়ালালামপুর তাদের আইনি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। অবৈধ নোঙর, পুনরায় সরবরাহ এবং সরকারি অনুমোদন ছাড়া ইইজেড-এ জাহাজ থেকে জাহাজে পণ্য স্থানান্তর ঠেকাতে গত জুনে মালয়েশিয়া তাদের ইইজেড আইন সংশোধন করেছে। তবে এ বিষয়ে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করেনি।
চার্লি ব্রাউনের মতে, যেকোনো সাধারণ দিনেই ওই এলাকায় ২০০টির মতো জাহাজ নোঙর করা থাকতে পারে, এর মধ্যে অর্ধেকই সম্ভবত ইরানের সঙ্গে যুক্ত।
আলজাজিরার পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট তথ্যে জানা গেছে, গত এক মাসে হিউম্যানিটিসহ ইরানের পতাকাবাহী ১৮টি তেলের ট্যাংকার ইওপিএল-এ পৌঁছানোর পরে ট্র্যাকিংয়ের বাইরে চলে গেছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ডোর নামের আরেকটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারকে মালাক্কা প্রণালি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যেতে দেখা গেছে। ওইদিন ইওপিএল-এ অন্তত ৫০টি মার্কিন বা ইইউ নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত জাহাজ তাদের এআইএস সিগন্যাল চালু রেখেই অবস্থান করছিল। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সেখানে আরও অনেক ‘ডার্ক’ জাহাজ অবস্থান করছে।
পেমেন্ট মেকানিজম এবং চীনের ভূমিকা
ইউরোপভিত্তিক বৈশ্বিক পূর্বাভাস পরামর্শক সংস্থা ‘জিওপলিটিক্যাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসেস'-এর মতে, ইওপিএল এলাকায় জাহাজগুলোর মধ্যে স্থানান্তরিত হওয়া ইরানের তেল বিক্রির কাজ সম্পন্ন হয় চীনের 'ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস)'-এর মাধ্যমে। এর ফলস্বরূপ মার্কিন নজরদারিতে থাকা সুইফট নেটওয়ার্কের বাইরে গিয়ে চীনা মুদ্রা রেনমিনবিতে তেলের দাম পরিশোধ করা যায়।
চীন আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের তেল কেনার কথা স্বীকার করে না। ওয়াশিংটন ডিসির চীনা দূতাবাসের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইওপিএল হয়ে চীনে ইরানের তেল পরিবহনের বিষয়ে তারা অবগত নন।
এছাড়া, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একাধিকবার বলে এসেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত অবৈধ একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিহীন লং-আর্ম জুরিসডিকশনের বিরোধিতা করে।
তবে গবেষক এরিকার মতে, চীনের কাস্টমসের ডেটা ইওপিএল দিয়ে যাবতীয় কার্গোটির উৎস ও গতিবিধি সম্পর্কে কিছু সূত্র দেয়।
তিনি বলেছেন, গত বছর ইরান চীনে প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে, অথচ চীনের কাস্টমসের তথ্যে ইরান থেকে তেল আমদানির কোনো হিসাব নেই। একই সময়ে কাস্টমসের তথ্য দেখায় যে, মালয়েশিয়া থেকে চীনের আমদানি মাঝেমাঝে মালয়েশিয়ার নিজস্ব তেল উৎপাদনের পরিমাণকে ব্যাপকভাবে ছাড়িয়ে যায়। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, এই অপরিশোধিত তেলের একটি অংশ অন্য কোথাও থেকে এসেছে।
অন্যদিকে, বেইজিং মার্কিন আইনি ব্যবস্থা থেকে নিজস্ব শোধনাগারগুলোকে রক্ষা করতে পদক্ষেপ নিচ্ছে। এপ্রিলের শেষ দিকে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানের তেল কেনার জন্য পাঁচটি টিপট শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ওই নির্দেশকে ব্লক করে দেয়। তাদের দাবি যে, এই নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ চলতি সপ্তাহে আরও ছয়টি তেলের ট্যাংকার এবং হংকং-চীনভিত্তিক পাঁচটি কোম্পানির উপর নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এগুলো ইরানের শ্যাডো ফ্লিট বা ছায়া নৌবহরের সাথে যুক্ত এবং চীনে তেল পরিবহন করছে। এ বিষয়ে বেইজিং এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে চীনা শোধনাগারগুলোর ইরানি অপরিশোধিত তেল কেনার পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইওপিএল-এর মতো নেটওয়ার্কগুলো বাকি তেলের বিক্রি সচল রেখেছে।
চার্লি ব্রাউন বলছেন, নিষেধাজ্ঞা কখনোই এসব কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে পারেনি। নিষেধাজ্ঞার কারণেই বাজারব্যবস্থা ও লেনদেন প্রক্রিয়ার বিবর্তন ঘটেছে। শুধুমাত্র অবরোধের কারণে ইরান থেকে চীনে তেল যাওয়া কিছু সীমার মধ্যে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন