প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাজবাড়ী, ২৩ আগস্ট, ২০২৬ : দেশের মৎস্য সম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের অন্যতম কারণ চায়না দুয়ারী জাল। চায়না কারেন্ট দুয়ারী জাল শুধুমাত্র দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সর্বনাশই করেনি, বরং দেশের নদ-নদী, খাল ও বিলে দেশি মাছ পাওয়ার ধারণা পাল্টে দিয়েছে।
জেলায় এমন এক সময় ছিল, যখন রাজবাড়ী জেলার নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয় ছিল সুস্বাদু ও দেশি মাছের জন্য একটি নিরাপদ আবাসস্থল। এখানে নদ-নদী ও জলাশয়ের পানিতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। তবে কালের বিবর্তনে, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব, জলাশয় ভরাট হওয়া এবং প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার ফলে অনেক দেশি প্রজাতির মাছ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।
তবে গত কিছু বছরের মধ্যে জেলা মৎস্য বিভাগের প্রচেষ্টার ফলে মাঠপর্যায়ে মৎস্য চাষীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরী হয়েছে। ফলে, বিলুপ্তপ্রায় দেশি মাছের উৎপাদনে অপার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের কাছ থেকে জানা গেছে, রাজবাড়ী জেলায় নদী, বিল, প্লাবনভূমি, পুকুর ও হাওর-বাওর মিলিয়ে মোট মৎস্য প্রজনন উৎপাদনের ক্ষেত্রের আয়তন ৪৪ হাজার ৮৮১ হেক্টর। ২০২৪-২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি বছর জেলায় ৩৩ হাজার ২৫২ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। এই জেলায় মোট মাছের চাহিদা ২২ হাজার ২৩৯.৮৬ মেট্রিক টন। চাহিদার তুলনায় ১১০১২ মেট্রিক টন বেশি উৎপাদন হওয়ায় উদ্বৃত্ত মাছ চাষিরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করে থাকেন।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পুনরায় চাষাবাদের জন্য ৬টি অভয়াশ্রম স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে গোয়ালন্দ উপজেলায় ১টি, কালুখালী উপজেলায় ২টি, পাংশা উপজেলায় ১টি এবং বালিয়াকান্দিতে ২টি রয়েছে।
মৎস্য সংশ্লিষ্ট ও চাষিরা জানান, আমাদের এলাকায় গত কিছু বছর আগে দেশি কই, শিং, মাগুর, টেংরা ও পাবদার মতো মাছের সরবরাহ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। বর্তমানে আধুনিক চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করে বদ্ধ পুকুরেও এসব মাছ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাজারে দেশি মাছের সরবরাহ আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
বালিয়াকান্দি উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ বাসসকে জানিয়েছেন, অভয়াশ্রম স্থাপনের ফলে নির্দিষ্ট এলাকায় সরকারিভাবে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় কেউ মাছ ধরার সাহস পায় না। এর ফলে ‘মা’ মাছ ডিম ছাড়ার সুযোগ পাচ্ছে, যা অভয় আশ্রম প্রতিষ্ঠার আগে সম্ভব ছিল না। এর ফলে দেশীয় প্রজাতির মাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও এখানকার সুফোলভোগী মৎস্য চাষিরা লাভবান হচ্ছেন।
তিনি বলেন, বিশেষ করে দেশি কই, শিং, মাগুর, বাইন, গুতুম, চান্দা, টেংরা, পাবদা, ঢেলা ও মলা জাতের মাছের চাষ ও উৎপাদন বাড়ার ফলে বাজারে আবারও এই মাছগুলোর সরবরাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তানভিরুল ইসলাম জানান, দেশি প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বাড়াতে জলাশয়ে অভয়াশ্রম স্থাপন, পোনা অবমুক্তকরণ, চাষিদের প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ যদি চলতে থাকে, তবে আগামীতে দেশি মাছের উৎপাদন আরও বাড়বে এবং বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা অনেক প্রজাতি আবারও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে বলে আমরা আশা করছি।
তিনি আরও বলেন, দেশি মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ আমিষের চাহিদা যেমন পূরণ করবে, তেমনি মাংসের ওপর নির্ভরতাও কমিয়ে আনবে। শুধু মাছের চাহিদা পূরণ করেই নয়, বরং দেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুল হক বাসসকে জানিয়েছেন, প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণের পাশাপাশি বদ্ধ জলাশয় ও পুকুরে দেশি প্রজাতির মাছ চাষে চাষিদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন দেশি মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও মৎস্য চাষিদের আয় বাড়ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন