প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জার্মান ফুটবলের রাজকীয় আঙিনায় বায়ার্ন মিউনিখের লাল জার্সির যে দাপট প্রতিনিয়ত দেখা যায়, তার পেছনে রয়েছে এক একচ্ছত্র আধিপত্যের কাহিনী। রেকর্ড বুন্দেসলিগা ট্রফি এবং ইউরোপীয় ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের স্মারক বহনকারী এই বাভারিয়ানরা যেন নিখুঁত জয়ের এক অবিরত যন্ত্র।
ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, জার্ড মুলার, লোথার ম্যাথিউস এবং ফিলিপ লামদের হাত ধরে সাফল্য শব্দটিকে নিজেদের সমার্থক বানিয়ে ফেলা বায়ার্ন মিউনিখের ইতিহাস কিন্তু সম্পূর্ণরূপে রোদেলা নয়। তাদের সমৃদ্ধ ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় বিদ্যমান, যেখানে টানা ১২ মাস ইউরোপের এই জায়ান্ট এক চরম দিশেহারা ও গড়পড়তা দলে রূপান্তরিত হয়েছিল।
অথচ ঐতিহাসিক পতনের জন্য কোনো পূর্বাভাস ছিল না বাভারিয়ানদের আঙিনায়। ১৯৮০-এর দশকে প্রখ্যাত কোচ ইউপ হাইনকেসের জাদুকরী ছোঁয়ায় জার্মানির ফুটবল মসনদে একচ্ছত্র রাজত্ব করছিল বায়ার্ন মিউনিখ।
একের পর এক লিগ শিরোপা জয়ের পর ১৯৯০ সালের দলবদলে স্টিফান এফেনবার্গ এবং ব্রায়ান লাউড্রুপের মতো তারকাদের দলে ভিড়িয়ে নিজেদের শক্তি আরো বাড়িয়ে নেয় ক্লাবটি। তরুণ এফেনবার্গ তৎকালীন গণমাধ্যমে দম্ভ করে বলেছিলেন, ‘অন্য দলগুলো বুন্দেসলিগা জেতার জন্য বড্ড বোকা, তাই আমি বাভারিয়ায় এসেছি।’ তবে ফুটবলের সবুজ গালিচা যে কারো দম্ভ সহ্য করে না, তা হাড়েনাতে টের পেতে খুব বেশি সময় লাগেনি বায়ার্নের। ১৯৯১-৯২ মৌসুম আসতেই একের পর এক নাটকীয় বিপর্যয়ে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে বায়ার্নের সেই সাজানো অহংকার।
পতনের রথটি আনুষ্ঠানিকভাবে ছুটতে শুরু করে জার্মান কাপের (ডিএফবি-পোখাল) ম্যাচ দিয়ে। অলিম্পিক স্টেডিয়ামের বিশাল গ্যালারির সামনে অনামি ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল এফসি হোমবার্গের মুখোমুখি হয়েছিল বায়ার্ন। কিন্তু সেদিন বাভারিয়ান সমর্থকদের বাকরুদ্ধ করে দিয়ে অতিরিক্ত সময়ের খেলায় ৪-২ গোলের ঐতিহাসিক জয় তুলে নেয় সফরকারীরা।
ঘরের মাঠে পুঁচকে এক ক্লাবের কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ার এই ঘা শুকানোর আগেই বিশ্বমঞ্চে আরেক চরম লজ্জার মুখে পড়ে বাভারিয়ানরা। উয়েফা কাপের প্রথম রাউন্ডেই আয়ারল্যান্ডের আধা-পেশাদার দল কর্ক সিটির সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে বসে বায়ার্ন।
যে দলের ফুটবলাররা দিনে সাধারণ চাকরি করতেন আর বিকেলে খেলায় নামতেন, তাদের রুখতেই ঘাম ছুটে যায় কোটি টাকার বায়ার্ন তারকাদের। ধারাবাহিক এই ব্যর্থতার ঝড় সামলাতে না পেরে তৎকালীন বায়ার্ন বোর্ড তড়িঘড়ি করে ইউপ হাইনকেসকে ছাঁটাই করে দেয়। তবে সমস্যার সমাধান তো দূরের কথা, হাইনকেসকে বরখাস্ত করার এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও করুণ করে তোলে। পরবর্তীতে যে ঘটনা নিয়ে আফসোস করে বায়ার্নের বিখ্যাত জেনারেল ম্যানেজার উলি হ্যেনেস অকপটে স্বীকার করেছিলেন, ‘হাইনকেসকে ওই মুহূর্তে বিদায় দেওয়াটাই ছিল আমার পুরো ফুটবল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ভুল।’
হাইনকেসের স্থানে তড়িঘড়ি করে ডাগআউটে বসানো হয় সদ্য অবসর নেওয়া ৩২ বছর বয়সী ডেনিশ কিংবদন্তি সোরেন লারবিকে। কিন্তু প্রথমবার কোচিংয়ের চেয়ারে বসা লারবির হাতে তখন এমনকি কোনো অফিসিয়াল কোচিং লাইসেন্সও ছিল না! অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার এই বিশাল ঘাটতি নিয়ে বায়ার্নের মতো পাওয়ারহাউস পরিচালনা করতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েন লারবি।
লারবির হাত ধরে ডেনমার্কের মাটিতে ইতিহাসঘেরা এক মহালজ্জার সাক্ষী হয় বায়ার্ন মিউনিখ। উয়েফা কাপের পরবর্তী পর্বে ডেনিশ ক্লাব ‘বোল্ডক্লুবেন ১৯০৩’-এর বিরুদ্ধে খেলতে গিয়ে বায়ার্ন জালে হজম করে বসে এক ডজন গোলের অর্ধেক! ডেনিশ দলটি বাভারিয়ানদের রক্ষণভাগকে তছনছ করে ৬-২ ব্যবধানে উড়িয়ে দেয়। ইউরোপীয় প্রতিযোগিতার ইতিহাসে বায়ার্নের মতো পরাশক্তির এই ধস ছিল এক অভাবনীয় ট্র্যাজেডি। দ্বিতীয় লেগে ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ না পেয়ে টুর্নামেন্ট থেকে অপমানজনক বিদায় নিতে হয় তাদের।
ইউরোপীয় ফুটবলের আঙিনা থেকে লজ্জাজনক বিদায়ের পর দেশের লিগেও ধস থামানো যাচ্ছিল না। ২০ দলের বুন্দেসলিগায় বায়ার্ন টেবিলের ১৪ নম্বরে নেমে যায়—যা ছিল রেলিগেশন জোন থেকে মাত্র কয়েক ধাপ ওপরে! পতন ঠেকানোর চরম আকুতিতে মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে লারবিকেও বরখাস্ত করা হয় এবং অভিজ্ঞ কোচ এরিখ রিবাক এসে কোনোমতে পতন সামলে দলকে ১০ নম্বর স্থানে রেখে মৌসুম শেষ করেন। সে মৌসুমে বায়ার্নের জয়ের চেয়ে হারের পাল্লা ছিল ভারী, ঘরের মাঠেই তারা হেরেছিল ৭টি ম্যাচ এবং পুরো মৌসুমে তাদের গোল ব্যবধান দাঁড়িয়েছিল ঋণাত্মক (-২)।
পরবর্তী মৌসুমে অবশ্য মেহমেত শল, থমাস হেলমার এবং ঘরের ছেলে লোথার ম্যাথিউসকে ফেরত এনে মোটা অঙ্কের দলবদলে নিজেদের আবারও পুনর্গঠন করেছিল বায়ার্ন মিউনিখ। বাভারিয়ানরা খুব দ্রুতই তাদের হারিয়ে যাওয়া রাজসিংহাসন উদ্ধার করে ফুটবলের রাজত্ব কায়েম করেছিল ঠিকই, কিন্তু ১৯৯১-৯২ মৌসুমটি ইতিহাসের পাতায় আজ অবধি বড় এক সতর্কবার্তা হয়ে রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন