প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দাবি করেছেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক তিনটি জাতীয় কমিটি বাতিল করতে হবে এবং ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিরাপত্তার দৃষ্টিভঙ্গিতে সম্ভব নয়। এই সংকটের সমাধান রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে করতে হবে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর শাহবাগে অনুষ্ঠিত নাগরিক সমাবেশে বক্তারা এসব মন্তব্য করেন, যা ‘সাম্প্রতিক চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে তিনটি আলাদা জাতীয় কমিটি গঠন করার প্রতিবাদে’ আয়োজন করা হয়।
সমাবেশের সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন। বক্তৃতা প্রদান করেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাইদ খান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ এবং ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা বকুল। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সদস্য দীপায়ন খীসা।
সভাপতির বক্তব্যে জাকির হোসেন উল্লেখ করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা মূলত জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা। এর সমাধানও রাজনৈতিকভাবে করতে হবে। তিনি জানান, সরকার গত ১০ সেপ্টেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে জাতীয়, নির্বাহী ও পরামর্শক—এই তিনটি কমিটি গঠন করেছে। এসব কমিটির কার্যপরিধিতে উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আইন সংস্কারের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, দুটি কমিটির জনবল ও অবকাঠামো ডিজিএফআই থেকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আবু সাইদ খান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জন্য ‘অনেক কিছু দেওয়া হয়েছে’—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘকাল ধরে কোনো জনগোষ্ঠী বঞ্চিত ও উপেক্ষিত থাকলে রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ শুধু বাঙালি বা মুসলমানের রাষ্ট্র নয়। পাহাড় অশান্ত থাকলে পুরো বাংলাদেশও শান্তিতে থাকতে পারবে না। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পাহাড়ের মানুষ অস্ত্র ছেড়েছে বলে তাদের সঙ্গে যা ইচ্ছা করা যাবে—এমন ধারণা ভুল। তিনি দাবি করেন, তিনটি কমিটি বাতিল করে চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে।
রুহিন হোসেন প্রিন্স মন্তব্য করেন, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নয়, রাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাই রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে এ চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি সতর্ক করেন যে, পাহাড়ের অন্যতম প্রধান সমস্যা ভূমি বিরোধের কার্যকর সমাধান না হলে নতুন সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
শামসুল হুদা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ ১৯৯৭ সালের চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি গঠিত তিনটি কমিটি আমলা ও গোয়েন্দা-নির্ভর হওয়ায় তা কাম্য নয়। তিনি দাবি করেন, আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সার্কেল চিফসহ পাহাড়ের বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে অর্থবহ সংলাপ করতে হবে।
নাজমুল হক প্রধান বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেও আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে না। তিনি বলেন, রাষ্ট্র যে চুক্তি করেছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্বও রাষ্ট্রের। তিনি তিনটি কমিটি বাতিল করে পাহাড়ের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করার দাবি জানান।
সন্তোষিত চাকমা বকুল বলেন, চুক্তি স্বাক্ষরের ২৯ বছর পরও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি সতর্ক করেন যে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পাহাড়ের জনগণ গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে।
সমাবেশ থেকে তিনটি জাতীয় কমিটি বাতিলের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটি গঠন, অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী প্রত্যাহার, চুক্তি অনুযায়ী উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠন, সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর করার দাবি জানানো হয়।
এছাড়া পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে সংলাপ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অংশগ্রহণে বহুপক্ষীয় অর্থবহ সংলাপ শুরুর দাবি জানান বক্তারা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন