প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
হেপাটাইটিস বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর এই রোগে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, যা প্রধানত লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের কারণে ঘটে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে যে, ভাইরাল হেপাটাইটিসজনিত মোট মৃত্যুর প্রায় ৯৫ শতাংশের জন্য দায়ী হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে সংস্থাটি একটি বার্তায় জানায়, বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার মানুষ নতুন করে হেপাটাইটিস ‘ বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত হয় এবং প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষ এই দুই সংক্রমণের কারণে প্রাণ হারায়।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ডব্লিউএইচও।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুসারে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ভাইরাল হেপাটাইটিস নিয়ে জীবনযাপন করছেন।
২০২৪ সালেই এ অঞ্চলে প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার নতুন হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ সংক্রমণ রিপোর্ট হয়েছে এবং প্রায় ২ লাখ হেপাটাইটিসজনিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। বিশ্বব্যাপী হেপাটাইটিস ‘সি’ আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার বিচারে, বাংলাদেশ শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে অন্যতম। সাধারণ জনগণের মধ্যে সক্রিয় হেপাটাইটিস ‘সি’ সংক্রমণের হার প্রায় শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ হলেও ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী ব্যক্তি, নিয়মিত রক্ত গ্রহণে নির্ভরশীল রোগী এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে সংক্রমণের হার অনেক বেশি।
একই সাথে, হেপাটাইটিস ‘বি’ সংক্রমণও দেশের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। ডব্লিউএইচও জানায়, ২০২৪ সালে বিশ্বে হেপাটাইটিস ‘বি’-জনিত মোট মৃত্যুর ৬৯ শতাংশ যে ১০টি দেশে ঘটেছে, বাংলাদেশ সেখানেও রয়েছে।
বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশে হেপাটাইটিস প্রতিরোধ, পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা আরো সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। ডব্লিউএইচওর মতে, কার্যকর টিকা, নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা ও উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও, জনসচেতনতার অভাব, দেরিতে রোগ শনাক্ত এবং সাশ্রয়ী মূল্যে পরীক্ষা ও চিকিৎসার সীমিত সুযোগ, সামাজিক অপবাদ এবং স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্যের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূলের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হেপাটাইটিস ‘বি’ প্রতিরোধে বহু বছর ধরে নিরাপদ ও কার্যকর টিকা আছে। অন্যদিকে হেপাটাইটিস ‘সি’ আধুনিক ওষুধের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। কিন্তু রোগটির প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত কোনো লক্ষণ না থাকায় অনেক রোগী সংক্রমণের বিষয়টি জানতে পারেন না। ফলে লিভার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর রোগ শনাক্ত করা হয়, তখন চিকিৎসা হয়ে ওঠে আরও জটিল ও ব্যয়বহুল।
বাংলাদেশে ডব্লিউএইচওর প্রতিনিধি ড. আহমেদ জামশেদ মোহাম্মদ বলেছেন, ভাইরাল হেপাটাইটিস প্রতিরোধযোগ্য, চিকিৎসাযোগ্য এবং হেপাটাইটিস ‘সি’-এর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। তবে সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ না পাওয়ায় অনেক মানুষ জীবনরক্ষাকারী সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি বলেন, হেপাটাইটিস প্রতিরোধ, পরীক্ষা ও চিকিৎসার পথে বিদ্যমান সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দ্রুত দূর করতে হবে।
ডব্লিউএইচও জানাচ্ছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ভাইরাল হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ২০২০-২০৩০ সালের জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা, নবজাতকের জন্মের পরপরই হেপাটাইটিস ‘বি’ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ এবং প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণের উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। সংস্থাটির কারিগরি সহায়তায় এসব কার্যক্রম ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূলে বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে বলেও আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে এখনও নানা কাঠামোগত ও সামাজিক বাধা রয়ে গেছে। অনেক মানুষ হেপাটাইটিস সম্পর্কে সচেতন নন, ফলে পরীক্ষা করান না। অনেক এলাকায় সহজলভ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নেই। সামাজিক অপবাদের কারণে অনেক রোগী চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। অনুপাত অনুযায়ী দরিদ্র, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা এখনও সীমিত।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চারটি অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে ডব্লিউএইচও। এগুলো হলো—জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস ‘বি’ টিকা নিশ্চিত করা, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন ও ইনজেকশন ব্যবস্থা জোরদার করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি; প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃস্বাস্থ্য, এইচআইভি, যক্ষ্মা ও রক্ত সঞ্চালন কর্মসূচির সঙ্গে হেপাটাইটিস পরীক্ষা ও চিকিৎসা একীভূত করা; জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে হেপাটাইটিস ‘সি’ চিকিৎসা সম্প্রসারণ, সাশ্রয়ী মূল্যে পরীক্ষা ও ওষুধ নিশ্চিত করা; এবং সংক্রমণ, চিকিৎসার ফলাফল, লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসার সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে জাতীয় নজরদারি ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করা।
সংস্থাটির মতে, রোগের প্রকৃত বোঝা নিরূপণ, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী শনাক্ত করা, নীতিনির্ধারণ ও বিনিয়োগের অগ্রাধিকার ঠিক করা এবং ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য শক্তিশালী তথ্যব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ড. আহমেদ জামশেদ মোহাম্মদ বলেন, ভাইরাল হেপাটাইটিস মোকাবিলায় বাংলাদেশ দৃঢ় অঙ্গীকার দেখিয়েছে এবং নির্মূলের পথে আরও দ্রুত অগ্রসর হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। সরকারের এই প্রচেষ্টায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভবিষ্যতেও কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূলে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সময়মতো পরীক্ষা, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, নবজাতকের জন্মের পরপরই টিকাদান এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে হেপাটাইটিস সেবা যুক্ত করার মতো পদক্ষেপ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্যের হুমকি হিসেবে নির্মূলের বৈশ্বিক লক্ষ্যে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের লিভার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. শাহেদ আশরাফ সেতু বলেছেন, হেপাটাইটিস শুধু একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, এটি একটি পরিবারের ওপর বড় অর্থনৈতিক চাপও সৃষ্টি করে। দেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ রোগীদেরই বহন করতে হয়। বিশেষ করে হেপাটাইটিস ‘বি’ রোগীর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও জটিলতার ব্যয় কয়েক লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে সময়মতো টিকাদান ও নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে এই বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন