প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সুন্দরবনের দুর্গম জঙ্গল, উত্তাল নদী, কাদামাটির পথ, বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চল ও পাহাড়ি জনপদ অতিক্রম করে ২২ দিনে ৭৮৩ কিলোমিটার হেঁটে কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের ঘোলারচরে পৌঁছেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) সাবেক শিক্ষার্থী ও পরিব্রাজক মাসফিকুল হাসান টনি। তাঁর এই পদযাত্রা শুরু হয়েছিল ১৪ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কৈখালীর পাঁচ নদীর মুখ থেকে এবং শেষ হয় ৫ অক্টোবর বিকেল ৪টা ২ মিনিটে। ‘বাংলাদেশ কোস্টাল ট্রাভার্স’ নামের অভিযানের মাধ্যমে তিনি উপকূলের পথে হেঁটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন।
টনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি বেঙ্গল পিস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পরিব্রাজক হিসেবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো টনির এবারের অভিযানের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল হেঁটে পাড়ি দেওয়া।
সুন্দরবনের দুর্গম পথ
কৈখালী থেকে যাত্রা শুরু করার পর প্রথমেই তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছে সুন্দরবনের প্রায় ১৬৫ কিলোমিটার পথ। একদিকে গভীর বন, অন্যদিকে নদী-খালের বিস্তৃত জাল। পথের সঙ্গে বদলেছে চারপাশের শব্দ, গন্ধ, মাটি ও মানুষের জীবনযাত্রা। সুন্দরবনের ওয়াপদা বাঁধের পথ ধরে হাঁটার সময় ভয়ও কাজ করেছে তাঁর মধ্যে। পথের চায়ের দোকানে বসে তিনি জলদস্যুদের নানা গল্প শুনেছেন।
সুন্দরবন পেরিয়ে সামনে এসেছে একের পর এক নদী। শিবসা, বলেশ্বর, বিষখালী, আন্দারমানিক, রামনাবাদ থেকে মহেশখালী চ্যানেল, সাঙ্গু ও মাতামুহুরীসহ অসংখ্য নদী-নালা ও খাল-বিল পেরিয়ে তিনি এগিয়ে গেছেন। কিছু নদী ছিল শান্ত, কিছু ছিল উত্তাল। উপকূলে তিন নম্বর সতর্কসংকেত চলাকালে তেঁতুলিয়া ও মেঘনা নদীও পাড়ি দিতে হয়েছে তাঁকে।
তেঁতুলিয়া নদী পার হওয়ার সময় বড় বড় ঢেউ নৌকায় আছড়ে পড়ছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে জীবন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। পরে মাঝির দক্ষতায় নৌকাটি নিরাপদে চরফ্যাশনে পৌঁছায়। দীর্ঘ এই যাত্রায় রাঙাবালি, চরমোন্তাজ, চর বাংলা, চরফ্যাশন, মনপুরা ও হাতিয়ার মতো দ্বীপাঞ্চল পেরিয়েছেন টনি।
কখনো কাদামাটি, কখনো পাহাড়ি পথ
কখনো কাদামাটি, কখনো পাথুরে পথ, আবার কখনো ঘন জঙ্গল কিংবা বিস্তীর্ণ চর—প্রতিটি পথেই ছিল ভিন্ন চ্যালেঞ্জ। মীরসরাই ও সীতাকুণ্ডের বেড়িবাঁধসংলগ্ন জঙ্গলপথও পাড়ি দিতে হয়েছে তাঁকে। একাকী চলার পথে একবার বিশাল একটি সাপ এবং পরে শেয়ালের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। মহেশখালীর পাহাড়ি পথ পেরিয়ে একসময় তাঁর যাত্রা মিলেছে মেরিন ড্রাইভ সড়কের সঙ্গে।
উপকূলের পথে হাঁটতে গিয়ে কাছ থেকে দেখেছেন জেলেদের মাছ ধরার ব্যস্ততা, শুঁটকি তৈরির প্রস্তুতি এবং উপকূলীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবন। একেক অঞ্চলের প্রকৃতি, মানুষের জীবনযাত্রা ও পথের বৈচিত্র্য তাঁর দীর্ঘ যাত্রাকে অভিজ্ঞতাবহুল করে তুলেছে।
অভিযানের অভিজ্ঞতা জানিয়ে কালের কণ্ঠকে টনি বলেন, ‘বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল পেরিয়ে প্রথমবারের মতো দেশের সমগ্র উপকূল হেঁটে পাড়ি দিয়ে নাফ নদীর পাড়ে পৌঁছেছি। দীর্ঘ ২২ দিনের এই যাত্রায় নানা বাধা, ভয় ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সব বাধা পেরিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছানোর আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘পথে শত শত গ্রাম, পাড়া-মহল্লা পেরিয়েছি। বলেশ্বর, বিষখালী, মোংলা, আন্দারমানিক ও মেঘনার মতো নদীপথ এবং বিভিন্ন দ্বীপাঞ্চল অতিক্রম করতে হয়েছে। প্রতিটি পথের অভিজ্ঞতা আলাদা, আর কিছু মুহূর্ত ছিল সত্যিই ভয়ংকর।’
অভিযানের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে টনি বলেন, ‘সুন্দরবনের দুর্গম পথ, উত্তাল নদী, বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চল এবং জনপদের পর জনপদ পেরিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছে। কখনো প্রতিকূল আবহাওয়া, কখনো বন্য প্রাণীর মুখোমুখি হওয়ার ভয়, আবার কখনো উত্তাল নদী পাড়ি দেওয়ার সময় জীবন নিয়ে শঙ্কায় পড়তে হয়েছে। তবুও সব বাধা অতিক্রম করে দেশের সর্বদক্ষিণের অবিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডের শেষ প্রান্ত ঘোলারচরে পৌঁছাতে পেরেছি।’
তিনি বলেন, ‘এই অভিযান শুধু দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা নয়, বরং দেশের উপকূলীয় জনপদ, মানুষের জীবনযাত্রা, প্রকৃতি ও বৈচিত্র্যকে কাছ থেকে জানার এক অসাধারণ সুযোগ। সব ভয় ও প্রতিকূলতা জয় করে লক্ষ্যে পৌঁছানোর আনন্দ সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’
ঘোলারচরে এসে থামল যাত্রা
দীর্ঘ ২২ দিনের অভিযান শেষে গত ৫ অক্টোবর বিকেল ৪টা ২ মিনিটে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের ঘোলারচরে পৌঁছান টনি। শেষ দিনের যাত্রার আগে রাত সাড়ে ৩টা থেকে বিদ্যুৎ না থাকায় তিনি ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি। ভোরে শুরু হয় ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, আকাশও ছিল কালো মেঘে ঢাকা। তবু বৃষ্টি মাথায় নিয়েই হাঁটা শুরু করেন।
জাহাজপুরা থেকে যাত্রা করে হাজমপাড়া, মারিস বুনিয়া, বড় ডেইল, কচ্ছপিয়া, নোয়াখালী পাড়া, হাবিব ছড়া ও টেকনাফ সমুদ্রসৈকত পেরিয়ে এগিয়ে যান শাহপরীর দ্বীপের দিকে। পরে সাবরাং বেড়িবাঁধের শূন্য পয়েন্ট পেরিয়ে বালুর পথ ধরে পৌঁছান দ্বীপে। সেখান থেকে দক্ষিণ পাড়া পেরিয়ে ঘোলারচরের শেষ প্রান্তে যেতে আরও পথ হাঁটতে হয়। জোয়ারের পানিতে ডুবে থাকা পথ এড়িয়ে তাঁকে ঘুরে যেতে হয় বেশ খানিকটা। প্রায় আধা ঘণ্টা বালুর পথ পেরিয়ে অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছান তিনি।
সেখানে দাঁড়িয়ে সামনে দেখেছেন বিশাল বঙ্গোপসাগর, আর নাফ নদীর ওপারে দেখা গেছে মিয়ানমারের ভূখণ্ড। দেশের সর্বদক্ষিণের অবিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তাঁর মনে ভেসে ওঠে গত ২২ দিনের অসংখ্য স্মৃতি।
হিসাবের খাতায় ৭৮৩ কিলোমিটার। কিন্তু এই পথের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুন্দরবনের ১৬৫ কিলোমিটার দুর্গম পথ, প্রতিকূল আবহাওয়ায় নদী পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা, কাদা-পাথর-জঙ্গল-পাহাড়ের চ্যালেঞ্জ, অসংখ্য মানুষের সঙ্গে পরিচয় এবং উপকূলের জীবনকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ। দীর্ঘ এই অভিযানের মধ্য দিয়ে ঘোলারচরে এসে শেষ হয়েছে টনির পদযাত্রা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন