প্রিন্ট এর তারিখঃ ২৬শে অক্টোবর, ২০২৬ইং; ০১:৩০ এম || প্রকাশের তারিখঃ ৯ই জুলাই, ২০২৬ইং; ১০:১৯ এম
মার্কিন-ইসরাইলের অবৈধ হামলাই কি ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে বাধ্য করছে?
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ শুধু ইরান, ইসরাইল কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার একটি সামরিক সংঘাত নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতারও কঠিন পরীক্ষা। প্রশ্নটি আজ আর কেবল তেহরানের নয়, বরং বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের সামনে—যদি কোনো দেশ আন্তর্জাতিক চুক্তি মেনে চলে, তবুও তার ওপর হামলা হয়, তাহলে সে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কীভাবে?
গত কয়েক বছরে ইরান একদিকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা চাপের মুখে পড়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ধারাবাহিক সামরিক ও গোয়েন্দা অভিযান, নিষেধাজ্ঞা, বিজ্ঞানী হত্যা এবং সরাসরি হামলারও শিকার হয়েছে। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এখন অনেক বিশ্লেষকই প্রশ্ন তুলছেন—ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের নীতিই কি শেষ পর্যন্ত ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে ঠেলে দিচ্ছে?
আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা নির্মম। যে রাষ্ট্রের হাতে শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে, তার বিরুদ্ধে হামলার আগে সবাই দশবার চিন্তা করে। উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পর বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্রও তার বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান চালানোর সাহস দেখাতে পারেনি। বিপরীতে, ইরাক, লিবিয়া কিংবা সিরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়—যেসব রাষ্ট্রের প্রতিরোধ সক্ষমতা দুর্বল, তারা বহিরাগত হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা Ali Khamenei বারবার বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্র ইসলামি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং ইরান এমন অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়নি। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস দেখায়, রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় আদর্শ নয়, বরং নিরাপত্তার কঠিন বাস্তবতা দ্বারা পরিচালিত হয়।
যদি একটি রাষ্ট্র বারবার হামলার শিকার হয়, তার সামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হন এবং শান্তি ও কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো বারবার ভেঙে পড়ে, তাহলে সেই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে—অসীম অনিশ্চয়তা মেনে নেওয়া অথবা এমন প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করা, যা ভবিষ্যৎ হামলার মূল্যকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল করে তুলবে।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠে আসে—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল কি নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের পরিবর্তে উল্টো ফল তৈরি করছে?
ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিটি সামরিক অভিযান, প্রতিটি নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং প্রতিটি হামলা তেহরানের অভ্যন্তরে একটি শক্তিশালী যুক্তিকে আরও জোরালো করে তুলতে পারে: "যদি আমাদের হাতে চূড়ান্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকে, তাহলে আমাদের সার্বভৌমত্ব কখনোই নিরাপদ হবে না।"
এটি কেবল ইরানের প্রশ্ন নয়। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্যও এটি একটি বিপজ্জনক বার্তা। কারণ যদি বিশ্ব এই ধারণায় উপনীত হয় যে, পারমাণবিক অস্ত্রই কেবল নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, তাহলে আরও অনেক রাষ্ট্র একই পথ অনুসরণ করতে উৎসাহিত হতে পারে। তখন বৈশ্বিক নিরস্ত্রীকরণ ব্যবস্থা, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তি এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট তাই একটি গভীর বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে। শক্তি প্রয়োগ করে কোনো রাষ্ট্রকে স্থায়ীভাবে নিরাপত্তাহীন রাখা যায় না। বরং অবিরাম সামরিক চাপ অনেক সময় সেই রাষ্ট্রকে আরও কঠোর এবং আরও বিপজ্জনক প্রতিরোধ কৌশল বেছে নিতে বাধ্য করে।
আজকের বাস্তবতায় প্রশ্নটি নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে—ইরান কি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায়, নাকি ধারাবাহিক সংঘাত, অবিশ্বাস এবং সামরিক চাপ তাকে সেই পথে ঠেলে দিচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর যাই হোক না কেন, একটি বিষয় স্পষ্ট: যদি কূটনীতির দরজা বন্ধ হয় এবং যুদ্ধই একমাত্র ভাষা হয়ে ওঠে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য আরও অস্থিতিশীল হবে এবং বিশ্ব হয়তো এমন এক নতুন পারমাণবিক বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাবে, যার দায় শুধু তেহরানের নয়, বরং সেই সব শক্তিরও, যারা সংঘাতের আগুনকে নিভানোর পরিবর্তে বারবার তাতে নতুন করে জ্বালানি যোগাচ্ছে। জ্বালানি যোগাচ্ছে।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন
কপিরাইট © ২০২৪-২৫ তালাশ বিডি.কম সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। || Design & Developed By "Talash BD Media Limited"