প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন যখন তুঙ্গে ছিল এবং রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবেশ নানা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করে আত্মশুদ্ধি ও দয়ার দীক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে আসেন মাওলানা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রসৈনিক শায়খুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির প্রিয় ছাত্র ও খলিফা। ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে শায়খুল ইসলাম মাদানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির সুপারিশে তিনি তৎকালীন মৌলভীবাজার সাবডিভিশন শহরের দারুল উলুম মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পাঠদান ও মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়নের পাশাপাশি ছাত্রদের চরিত্র গঠন এবং আত্মশুদ্ধির দিকে তিনি বিশেষ মনোযোগ দেন।
মাদরাসার জায়গির হিসেবে তিনি মনু নদীর অপর পারে বালিকান্দি গ্রামে অবস্থান করতেন। বালিকান্দিতে একটি মাজারকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর উরস অনুষ্ঠিত হতো। শায়খ বর্ণভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি মানুষের ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি গ্রামের কিশোর ও যুবকদের সংগঠিত করেন এবং তাদের তাফসির মাহফিল, দ্বীনি কার্যক্রম, খেলাধুলা ও সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত করেন। দৌড়, লাঠিখেলা সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো; তিনি নিজে উপস্থিত থেকে বিজয়ীদের পুরস্কৃত করতেন। এইভাবে যুবকদের মধ্যে শৃঙ্খলা, ঐক্য ও দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। তাদের নিয়ে গঠিত কমিটির নাম রাখা হয় ‘হেফাজতে ইসলাম কমিটি’। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এই কমিটিই পরে আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক ভিত্তি হিসেবে বিকশিত হয়।
বৃহত্তর সাংগঠনিক রূপ
পরে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী ও ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলামসহ কয়েকজন বিশিষ্ট আলেমও ‘হেফাজতে ইসলাম’ নামে সংস্কারমূলক কাজ পরিচালনা করছেন। সে সময় যোগাযোগব্যবস্থা সীমিত থাকায় তারা পরস্পরের কার্যক্রম সম্পর্কে আগে অবগত ছিলেন না। বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার পর ঢাকার সিদ্দিকবাজার জামে মসজিদে তাদের মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্যের উদ্দেশ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সংগঠনের নেতৃত্ব ও কার্যপরিধি নিয়ে আলোচনা হয়। একপর্যায়ে মতপার্থক্যের সৃষ্টি হলেও আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির বিচক্ষণ উদ্যোগে তা ঐক্যে পরিণত হয়। তিনি দ্বীনের কাজকে ব্যক্তিগত নেতৃত্বের ঊর্ধ্বে রেখে শায়খ বর্ণভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে আমির হিসেবে মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান। সবাই এতে সম্মত হন।
এরপর বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ বিস্তারের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। শায়খ বর্ণভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি সিলেট ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় সফর করেন। অন্যদিকে আল্লামা ফরিদপুরী ঢাকা বিভাগে এবং ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম চট্টগ্রাম বিভাগে দাওয়াত ও ইসলাহি কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এই সমন্বিত প্রচেষ্টায় হেফাজতে ইসলামের কার্যক্রম বৃহত্তর জনপরিসরে বিস্তৃত হয়।
মূল দর্শন ও কর্মসূচি
আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হলো কোরআন-সুন্নাহর আলোকে আলোকিত, নৈতিক ও কল্যাণমুখী জাতি এবং সমাজ গঠন করা এবং এর মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করা। সংগঠনের সার্বিক কার্যক্রম কোরআন-সুন্নাহ, খুলাফায়ে রাশেদীন ও সালাফে সালেহীনের অনুসৃত আদর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
আঞ্জুমানের প্রধান কর্মসূচি ছয়টি—১. দাওয়াত বা মানুষকে ভালো কাজের আহ্বান, ২. সংগঠন বা মানুষকে সংঘবদ্ধ করা, ৩. তালিম বা সৎশিক্ষা, ৪. তারবিয়াত বা ভালো আচরণে অভ্যস্ত করা এবং তাজকিয়া বা ব্যক্তির আত্মশুদ্ধি, ৫. খেদমতে খালক তথা মানবসেবা ও ৬. আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার বা সমাজে ভালো কাজের আদেশ এবং খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করা।
ছাত্র, যুব ও নারী কার্যক্রম
নতুন প্রজন্মকে আদর্শবান ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে আঞ্জুমানের রয়েছে পৃথক অঙ্গসংগঠন। এর মধ্যে আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম যুবকাফেলা ও আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম ছাত্রকাফেলা উল্লেখযোগ্য। দ্বীনদার ও আদর্শবান নারী সমাজ গঠনের জন্য রয়েছে আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে হেফাজতে ইসলাম।
অন্যান্য কার্যক্রম
দ্বীনি জ্ঞান সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে আঞ্জুমানের মুখপত্র ‘মাসিক হেফাজতে ইসলাম’সহ বিভিন্ন দ্বীনি গ্রন্থ ও প্রকাশনা প্রকাশিত হয়ে আসছে। এর মাধ্যমে জরুরিয়াতে দ্বীন, ঈমান-আকিদা, আমল-আখলাক, আত্মশুদ্ধি ও সমাজ সংস্কারের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠাতা শায়খ বর্ণভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির পর তার জানিশীন মাওলানা খলীলুর রহমান দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে আমির হিসেবে মুফতি মুহাম্মদ রশীদুর রহমান ফারুক বর্ণভী আঞ্জুমানের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তার নেতৃত্বে সংগঠনটি দাওয়াত, তালিম, তারবিয়াত, তাজকিয়া, মানবসেবা ও সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরো বিস্তৃত করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।
আঞ্জুমানের ঐতিহ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—মতভেদ ও বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্য, সংঘাতের পরিবর্তে শান্তি এবং সংকীর্ণতার পরিবর্তে বৃহত্তর দ্বীনি কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি এই আদর্শকে সামনে রেখে মানুষের ঈমান, আমল ও আখলাকের উন্নয়ন এবং একটি নৈতিক ও কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে আসছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন