প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ১৩০ কোটিরও বেশি মানুষ উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনে ভুগছেন। হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল হওয়া এবং অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এটি। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, কারণ এটি কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি করতে পারে।
সাধারণত রক্তচাপ মেপে এই রোগ নির্ণয় করা হলেও তা শরীরের ভেতরে ইতোমধ্যেই ঘটে যাওয়া ক্ষতির প্রকৃত রূপ প্রকাশ করতে পারে না। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের গবেষকরা ‘হাইপ্রিভেন্ট’ নামের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। এই প্রযুক্তি উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ইনোভেশনসের তথ্যমতে, ‘হাইপ্রিভেন্ট’ প্ল্যাটফর্মটি একটি অভিনব কম্পিউটেশনাল ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করে এবং এটি এআই, কন্ট্রাস্টিভ লার্নিং এবং বিভিন্ন অঙ্গের ক্লিনিকাল ও ইমেজিং ডেটার সমন্বয়ে কাজ করে।
এটি কেবল রক্তচাপের রিডিংয়ের ওপর নির্ভর না করে, বরং বিভিন্ন অঙ্গের ডেটা বিশ্লেষণ করে রোগের তীব্রতার ধরন এবং এর গতিপ্রকৃতি মানচিত্রের মতো ফুটিয়ে তোলে। সুস্থ এবং উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত উভয় শ্রেণির মানুষের ডেটা দিয়ে এই এআই-কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, ফলে এটি নিখুঁতভাবে রোগীর শারীরিক ক্ষতির ধরন বিশ্লেষণ করতে পারে।
গবেষকদের মতে, একই রক্তচাপের রিডিং থাকা দুজন রোগীর অভ্যন্তরীণ অঙ্গের ক্ষতি এবং ভবিষ্যতের কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকির মাত্রা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। ‘হাইপ্রিভেন্ট’ ঠিক এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটিই ধরে ফেলে।
দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ রক্তচাপ শরীরের রক্তনালী এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর মারাত্মক ক্ষতি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ৮ লাখ মানুষ উচ্চ রক্তচাপজনিত কারণে মারা যান।
বিশেষজ্ঞরা উচ্চ রক্তচাপজনিত অঙ্গের ক্ষতি বা এইচএমওডি-কে চিহ্নিত করাকে খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে হার্টের পেশি পুরু হয়ে যাওয়া, কিডনির কার্যক্ষমতা হ্রাস, ধমনী শক্ত হয়ে যাওয়া, মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম রক্তনালীর ক্ষতি, এবং চোখের রেটিনার সমস্যা। ‘জার্নাল অব হিউম্যান হাইপারটেনশন’-এ প্রকাশিত গবেষণা বলছে, এই অঙ্গগুলোর ক্ষতিই যেহেতু রোগীর ভবিষ্যৎ হার্ট অ্যাটাক বা মৃত্যুর সবচেয়ে বড় পূর্বাভাস, সাধারণ পরীক্ষায় এই ক্ষতিগুলো ধরা পড়ে না। এখন এই এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে আগেভাগেই ধরা সম্ভব।
অক্সফোর্ডের এই উদ্যোগটি মূলত কার্ডিওভাসকুলার চিকিৎসায় এআই ব্যবহারের একটি ধারাবাহিক অংশ। এর আগে ২০২৪ সালে অক্সফোর্ডের র্যাডক্লিফ ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিনের গবেষকরা একটি এআই সিস্টেম তৈরি করেছিলেন যা নিয়মিত কার্ডিয়াক সিটি স্ক্যান বিশ্লেষণ করে ১০ বছর আগেই হার্ট অ্যাটাক ও হার্ট ফেইলিউরের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম। সম্প্রতি আরেকটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গবেষকরা উপসর্গ দেখা দেওয়ার অন্তত ৫ বছর আগেই ৮৬ শতাংশ নির্ভুলতায় হার্ট ফেইলিউরের পূর্বাভাস দিতে পেরেছেন।
ভবিষ্যতের ক্লিনিকাল ট্রায়ালে সফল হলে ‘হাইপ্রিভেন্ট’ রোগীদের জন্য বেশ কিছু বড় সুবিধা নিয়ে আসবে। তাতে দ্রুত রোগ নির্ণয়, ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা, এবং নতুন ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়া সহজ হবে।
তবে প্রযুক্তিটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হলেও, এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সাধারণ চিকিৎসায় নিয়মিত ব্যবহারের আগে বিভিন্ন জাতি ও অঞ্চলের মানুষের ওপর এর ব্যাপক পরীক্ষা প্রয়োজন। এই এআই সিস্টেমটি যেন কোনো সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারে এবং বিদ্যমান চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, তা নিশ্চিত করার পরই এটি বিশ্বজুড়ে ব্যবহারের অনুমোদন পাবে।
সবশেষে, অক্সফোর্ডের ‘হাইপ্রিভেন্ট’ প্ল্যাটফর্মটি উচ্চ রক্তচাপের সুপ্ত শারীরিক প্রভাবগুলো বোঝার ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক। চিকিৎসা বিজ্ঞান যেভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আপন করে নিচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবেই উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের জীবন বাঁচাতে এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতের ওপর উচ্চ রক্তচাপের চাপ কমাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সূত্র: এনডিটিভি
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন