প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সরকার আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ১ কোটি বাংলাদেশির জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থানের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। শ্রমবাজারের বহুমুখীকরণ, ব্যাপক দক্ষতা উন্নয়ন, অভিবাসন ব্যয় কমানো, অভিবাসন সেবার ডিজিটালাইজেশন এবং প্রবাসী কর্মীদের জন্য কল্যাণমূলক কর্মসূচি বৃদ্ধি করেই এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে চায়।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর বাসস’কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে এ রোডম্যাপ তুলে ধরেছেন। তিনি আরো বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের গতানুগতিক শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিদেশে অভিবাসনকে আরও স্বচ্ছ, সাশ্রয়ী ও দক্ষতাভিত্তিক করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমাদের নির্বাচনি অঙ্গীকার হলো পাঁচ বছরে এক কোটি বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। আমরা ইতোমধ্যে সেই লক্ষ্য অর্জনে কাজ শুরু করেছি।’ প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলো থেকে চাহিদার পূর্বাভাস সংগ্রহ করেছে। সেখানে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ বিদেশি কর্মীর চাহিদা চিহ্নিত হয়েছে, যা লক্ষ্য অর্জনের জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের কাজ দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা এবং তাদের বিদেশের ওই সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করা। আমি বিশ্বাস করি, অভিবাসন প্রক্রিয়া আরও সুশৃঙ্খল করে পাঁচ বছরের মধ্যে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।’ নুর জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ১১ থেকে ১২ লাখ বাংলাদেশি কাজের জন্য বিদেশে যান। পরিকল্পনা অনুযায়ী আরও দক্ষ কর্মী তৈরি করে সরকার ধীরে ধীরে এ সংখ্যা বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, সরকারের অভিবাসন সংস্কার কৌশল তৈরি হয়েছে অভিবাসন প্রক্রিয়া সহজ করা, অভিবাসন ব্যয় কমানো, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং প্রবাসী কল্যাণ জোরদার করার প্রধান অগ্রাধিকারের ওপর। তিনি আরও জানিয়েছেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দালালের ওপর অপ্রয়োজনীয় নির্ভরতা কমাতে বিদেশগমন প্রক্রিয়াকে ধীরে ধীরে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।
এটি নিয়ে নুর বলেন, ‘আমরা চাই প্রবাসী কর্মীরা যেন এক জায়গা থেকেই সব সেবা পান। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে হয়রানি কমানো, প্রক্রিয়া সহজ করাও, যাতে সাধারণ মানুষের জন্য বিদেশ যাওয়া সহজ হয়।’ তিনি এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন, বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের খরচ কমাতে সরকার দেশভিত্তিক অভিবাসন ব্যয় কাঠামো চালুর পরিকল্পনাও করছে।
একই সঙ্গে, সরকার এখন অদক্ষ অভিবাসনের বদলে দক্ষতাভিত্তিক বৈদেশিক কর্মসংস্থানের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। দেশের ১১০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে (টিটিসি) আধুনিক করার উদ্যোগের মধ্যে মন্ত্রণালয়টি বিশ্ব শ্রমবাজারের দ্রুত পরিবর্তনশীল চাহিদার এটি লক্ষ্য।
প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ‘দক্ষতা ছাড়া বিদেশে চাকরি পাওয়া বা টিকে থাকা এখন খুব কঠিন। সে কারণে দক্ষতা উন্নয়ন আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’ বাংলাদেশ প্রশিক্ষিত কর্মীদের একটি ডিজিটাল ডাটাবেজও তৈরি করছে, যার মাধ্যমে বিদেশি নিয়োগকর্তারা পেশার চাহিদা অনুযায়ী সরাসরি প্রার্থী বাছাই করতে পারবেন।
তিনি বলেন, ‘যদি কোনো দেশের ১০ হাজার জাহাজ নির্মাণ শ্রমিক বা প্রশিক্ষিত নারী কেয়ারগিভারের প্রয়োজন হয়, নিয়োগকর্তারা আমাদের ডাটাবেজে খুঁজে সঙ্গে সঙ্গেই যোগ্য কর্মী খুঁজে পাবেন।’ আঞ্চলিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণের জন্য, সরকার ইউরোপ ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে শ্রম বাজার সম্প্রসারণ করছে।
নুর বলেন, জনমিতিক পরিবর্তন ও প্রযুক্তিগত রূপান্তরের কারণে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বাড়ায় ইউরোপ ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য বড় গন্তব্য হবে। প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলোকে দেশভিত্তিক শ্রম চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে সাজানোর কাজ চলছে। জাপানের বিষয়ে তিনি জানান, দেশটিতে ১ লাখ কর্মী পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের চুক্তিটি এখনও কার্যকর রয়েছে, তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘বড় পরিসরে নিয়োগ বাড়ানোর আগে জাপান বাংলাদেশি কর্মীদের কাজের মান, শৃঙ্খলা ও কাজের সংস্কৃতি মূল্যায়ন করছে। আস্থা তৈরি হলেই নিয়োগের গতি বাড়বে।’ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়েও আশা প্রকাশ করেছেন নুর। এ ব্যাপারে স্বচ্ছ ও প্রায় শূন্য-খরচের নিয়োগ ব্যবস্থা চালু করতে দুই দেশ নীতিগত সমঝোতায় পৌঁছেছে।
তিনি জানিয়েছেন, শিগগিরই মালয়েশিয়ার একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করবে। এরপর দুই দেশের যৌথ ওয়ার্কিং কমিটি বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সংশোধনের কাজ করবে। নুর বলেন, ভবিষ্যৎ নিয়োগের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী কমানো, ন্যায্যতা নিশ্চিত করা এবং কর্মী শোষণ বন্ধে দুই পক্ষই অঙ্গিকারবদ্ধ। এটি বাংলাদেশের মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক আলোচনার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর নিয়োগ এবং অভিবাসন ব্যয় কমানোর বিষয়ে বলা হয়েছিল।
শ্রম বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি, সরকার বেশ কিছু কল্যাণমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংকিং সুবিধা এবং কিউআর-কোড-ভিত্তিক যাচাইকরণ সুবিধা সম্বলিত একটি ডিজিটাল ‘প্রবাসী কার্ড’। মন্ত্রণালয় বৈদেশিক কর্মসংস্থান সেবাও ডিজিটাল করতে চলছে। ফলে, অভিবাসন ছাড়পত্র ও কাগজপত্র জমা দেওয়া এখন অনলাইনে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
প্রবাসীদের দেশে ফেরার পর বিনিয়োগে উৎসাহিত করার জন্য সরকার একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল, একটি স্কিল ইনভেস্টমেন্ট পার্ক, আবাসন প্রকল্প এবং একটি ‘প্রবাসী সিটি’ নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনা করছে। নুর বলেন, প্রবাসীদের সন্তানদের জন্য বৃত্তি কর্মসূচি, আহত হয়ে ফেরা কর্মীদের আর্থিক সহায়তা এবং বিপদগ্রস্ত অভিবাসী, বিশেষ করে নারীদের পুনর্বাসন সহায়তা চালু থাকবে।
তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র বেশি কর্মী বিদেশে পাঠানো নয়, বরং তাদের যেন নিরাপদে যেতে পারে, মর্যাদার সঙ্গে কাজ করতে পারে এবং পুরো অভিবাসন যাত্রায় সঠিক সহায়তা পায়, সেটাও নিশ্চিত করা।’
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন