প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নারায়ণগঞ্জ শহরের ৩১৭, নবাব সলিমুল্লাহ রোড, ডন চেম্বারে পরিচালিত ‘মেডিস্টার হসপিটাল এন্ড রেনেসাঁ ল্যাব’-এর বিরুদ্ধে ফায়ার সেফটি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধ এবং চিকিৎসাসেবা পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডাঃ লায়লা পারভীন বানুকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে শোকজ নোটিশ দিয়েছে ‘বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড প্রেস সোসাইটি’। সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ রনি শিকদারের স্বাক্ষরিত নোটিশে বলা হয়েছে, সংগঠনটির অফিসিয়াল বিচারিক সেল ও আইন বিভাগের মাধ্যমে জনস্বার্থ ও মানবাধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যে ওই নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশে প্রাপক হিসেবে ডাঃ লায়লা পারভীন বানুর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তার পিতা মৃত হাজী খয়রুদ্দিন, মাতা মৃত জাহানারা বেগম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, স্থায়ী ঠিকানা কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার বালিয়ামারা এবং বর্তমান ঠিকানা নারায়ণগঞ্জের ১৩/১ ব্যাংক কলোনী, নিউ খানপুর রোড উল্লেখ করা হয়েছে। হাসপাতালের ঠিকানা হিসেবে ৩১৭, নবাব সলিমুল্লাহ রোড, ডন চেম্বার, নারায়ণগঞ্জ উল্লেখ রয়েছে।
স্থানীয় নাগরিকদের অভিযোগের দাবি: নোটিশে বলা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় সচেতন নাগরিক এবং প্রতিষ্ঠানটিতে চিকিৎসা নিতে এসে কথিত জালিয়াতি ও প্রতারণার শিকার কয়েকজন ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগ সংগঠনটির কার্যালয়ে জমা হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, এসব অভিযোগের পর তাদের কেন্দ্রীয় বিশেষ অনুসন্ধান সেল বিষয়টি পর্যালোচনা করেছে। ওই পর্যালোচনার ভিত্তিতে হাসপাতালটির বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে নোটিশে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়নি। ফলে অভিযোগগুলো বর্তমানে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।
ফায়ার সেফটি নিয়ে অভিযোগ: নোটিশে অভিযোগ করা হয়েছে, হাসপাতালটি একটি বহুতল ভবনে পরিচালিত হলেও সেখানে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের বৈধ ফায়ার লাইসেন্স এবং পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। এ বিষয়ে ‘অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন, ২০০৩’-এর বিভিন্ন বিধানের কথা উল্লেখ করে সংগঠনটি দাবি করেছে, ফায়ার নিরাপত্তার যথাযথ ব্যবস্থা ছাড়া হাসপাতাল পরিচালনা রোগী, বিশেষ করে প্রসূতি মা ও নবজাতকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তবে আইনের ধারা প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রকৃত পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন/ছাড়পত্র যাচাই প্রয়োজন। সরকারি আইনভান্ডারের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালের আইনে বহুতল ও বাণিজ্যিক ভবনের অগ্নি নিরাপত্তা এবং ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্রসংক্রান্ত বিধান রয়েছে। নোটিশে এ অভিযোগের সঙ্গে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৩৬ ধারার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য লাইসেন্স ছাড়া ক্লিনিক পরিচালনার অভিযোগ: নোটিশে ‘দি মেডিকেল প্র্যাকটিশনারস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২’-এর বিধান উল্লেখ করে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় সরকারি লাইসেন্স ছাড়া ক্লিনিক ও প্যাথলজি ল্যাব পরিচালনা করা বেআইনি। প্রচলিত আইনের সরকারি পাঠ অনুযায়ী, ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশের ধারা ৮-এ লাইসেন্স ছাড়া প্রাইভেট ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই আইনে লাইসেন্সের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, পর্যাপ্ত জায়গা, অপারেশন থিয়েটার, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, নিবন্ধিত চিকিৎসক-নার্স এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতো শর্তের কথা বলা হয়েছে। তবে নোটিশে ধারা ৩-এরও উল্লেখ করা হয়েছে। আইনের সরকারি পাঠ অনুযায়ী ধারা ৩ মূলত প্রাইভেট ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরিতে বিভিন্ন চিকিৎসা ও পরীক্ষার জন্য সর্বোচ্চ নির্ধারিত ফি/চার্জসংক্রান্ত।
চিকিৎসকের শারীরিক সক্ষমতা নিয়েও অভিযোগ: নোটিশে ডাঃ লায়লা পারভীন বানুর বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়েছে, তিনি বয়োবৃদ্ধ এবং শারীরিক অসুস্থতার কারণে একা চলাফেরায় সক্ষম নন-এমন অবস্থায়ও প্রসূতি মায়েদের সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করছেন। সংগঠনটি দাবি করেছে, জটিল অস্ত্রোপচার পরিচালনার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের শারীরিক সক্ষমতা ও রোগীর নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ অভিযোগের সঙ্গে নোটিশে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) আইন, ২০১০-এর ২৯ ও ৩০ ধারা এবং দণ্ডবিধির ৩০৪(ক) ধারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের প্রকৃত শারীরিক সক্ষমতা, তিনি বর্তমানে অস্ত্রোপচার করেন কি না এবং তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা কর্তৃপক্ষের নথি ও বক্তব্য প্রয়োজন।
ভ্যাট-ট্যাক্স ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ: নোটিশে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এবং আয়কর আইন, ২০২৩ লঙ্ঘনের অভিযোগও করা হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, সরকারি রাজস্ব ও ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন না করেও চিকিৎসাসেবা পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে নোটিশে রাজস্ব ফাঁকির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ, সংশ্লিষ্ট করবর্ষ, তদন্ত প্রতিবেদন বা এনবিআরের কোনো সিদ্ধান্ত উল্লেখ করা হয়নি। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ: নোটিশে বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠান, ভুল পরীক্ষা বা কথিত ভুয়া চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়লে তা নাগরিকের জীবন ও আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
সংগঠনটি দাবি করেছে, চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানবাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাঁচ ধরনের নথি চাওয়া হয়েছে নোটিশে ডাঃ লায়লা পারভীন বানুকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে নিম্নলিখিত নথিগুলোর সত্যায়িত কপি জমা দিতে বলা হয়েছে-১. ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের হালনাগাদ ফায়ার সেফটি লাইসেন্স। ২. স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হালনাগাদ ক্লিনিক ও প্যাথলজিক্যাল ল্যাব লাইসেন্স। ৩. নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স। ৪. আয়কর ও ভ্যাট পরিশোধের বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হালনাগাদ চালানের অনুলিপি। ৫. বিএমডিসি নিবন্ধনের কপি এবং সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার পরিচালনার উপযোগী শারীরিক সক্ষমতার ডাক্তারি সনদপত্র। সাত দিনের মধ্যে জবাবের নির্দেশ: নোটিশে জানতে চাওয়া হয়েছে, উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে কেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা হবে না। এ জন্য নোটিশ প্রাপ্তির সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্টে রিটের হুঁশিয়ারি: নোটিশে আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত সাত কার্যদিবসের মধ্যে নথিপত্র দাখিল করতে ব্যর্থ হলে সাধারণ মানুষের জীবন ও মৌলিক অধিকার রক্ষার স্বার্থে সংগঠনটির পক্ষ থেকে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়েরের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন/জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, সিভিল সার্জন, ফায়ার সার্ভিস, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) অভিযোগ পাঠানোর কথাও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি: নোটিশে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে মেডিস্টার হসপিটাল এন্ড রেনেসাঁ ল্যাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডাঃ লায়লা পারভীন বানু বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য ওই নোটিশের সঙ্গে সংযুক্ত নেই। অভিযোগগুলোর বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স, সিটি কর্পোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স এবং এনবিআরের রাজস্ব-সংক্রান্ত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড প্রেস সোসাইটির সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ রনি শিকদার স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে জনস্বার্থ ও মানবাধিকার সুরক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্ত বা আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই গণ্য করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজনযোগ্য। চলবে..........
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন