প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
২০২৪ সালের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত গণঅভ্যুত্থানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ছিল আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে শুরু থেকেই পুরুষ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শত শত নারী শিক্ষার্থীও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ ছিলেন মিছিলের সামনের সারিতে, আবার কেউ আহতদের উদ্ধার ও চিকিৎসায় সহযোগিতা করেছেন। কেউ কেউ হলের বিধিনিষেধকে উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসেন। যদিও ইন্টারনেট বন্ধ ছিল, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ ছিল না এবং নিরাপত্তাহীনতার দুরবস্থায় অনেকেই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরেও রাবির নারী শিক্ষার্থীদের সাহস, ত্যাগ ও নেতৃত্বের বিভিন্ন দিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান সত্ত্বেও ঐ অভিজ্ঞতার অধিকাংশ তথ্য এখনও পর্যাপ্তভাবে নথিবদ্ধ হয়নি।
আন্দোলনের শুরুতে অনেক নারী শিক্ষার্থী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তবে সহিংসতার মাত্রা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা সংগঠিতভাবে আন্দোলনে যোগ দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত রোকেয়া হল, জুলাই-৩৬ হল (তৎকালীন বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল), মন্নুজান হল, বেগম খালেদা জিয়া হলসহ মোট ছয়টি ছাত্রী হল থেকে শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে মিছিল ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা এবং বিভিন্ন প্রকারের বাধা সত্ত্বেও তারা রাজপথে অবস্থান নিয়েছিলেন।
একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হলে এবং হল ছাড়ার বাধ্যবাধকতা আসলে নারী শিক্ষার্থীরা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে বাধ্য হন। অনেকেই তাৎক্ষণিকভাবে বাড়ি ফিরতে পারেননি। ট্রেন এবং বাসের চলাচল ঠিক নয়, ইন্টারনেট বন্ধ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় অনেকেই রাজশাহীতে আটকে থাকতে হয়েছিল। পরবর্তীতে তারা বিভিন্ন মেস, পরিচিতজন বা সহপাঠীদের বাসায় আশ্রয় নেন। তবে মেসে পুলিশের তল্লাশির খবর ছড়িয়ে পড়ায় সেখানে অনিরাপত্তার সৃষ্টি হয়। প্রায় এক সপ্তাহ পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে তারা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে সক্ষম হন। পরে তারা নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করেও ৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।
আন্দোলনের অংশগ্রহণের পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীরা ব্যানার তৈরি করেছেন, কর্মসূচির সমন্বয় করেছেন, আহতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এবং সহপাঠীদের সহায়তায় বিবিধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সংঘাতের মুহূর্তেও তারা পিছপাতে রাজি হননি; বরং সহপাঠীদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে মানববর্ম তৈরি করে পেশাদারী আত্মত্যাগ করেছেন।
জুলাই আন্দোলনের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক পরিষদের অন্যতম নারী সদস্য তাসিন খান উল্লেখ করেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পর আমি সমন্বয়ক পরিষদে যুক্ত হই। তখন মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম—স্বাভাবিক জীবনে হয়তো আর ফেরা হবে না। মনে হয়েছিল, বেঁচে থাকলে হয়তো জেলে যেতে হবে অথবা পলাতক জীবন কাটাতে হবে। ৫ আগস্টের পরের জীবনকে আমি বোনাস জীবন মনে করি। জুলাই আমাকে বিবেকের গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করিয়েছে। আন্দোলনের পর আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছি। বিভিন্ন সুযোগ এলেও আমি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হইনি। রাজনীতিসচেতন নাগরিক হিসেবে থাকতে চাই এবং দলান্ধতাকে সবসময় প্রত্যাখ্যান করি।"
তিনি আরও বলেন, "জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরও সেই সময়ের অভিজ্ঞতা আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিগুলোর একটি। ন্যায়বিচার ও অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সাহস, ঐক্য ও দায়িত্ববোধের কোনো বিকল্প নেই।"
অন্যদিকে, আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা আরেক নারী শিক্ষার্থী এবং রাকসুর মহিলা বিষয়ক সম্পাদক সাইয়েদা হাফসা বলেন, "কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল একটি যৌক্তিক আন্দোলন। তাই শুরু থেকেই আমরা এর সঙ্গে জড়িত ছিলাম। আমাদের সংগঠনের সদস্যরা ৭ জুলাই থেকেই অনলাইন ও অফলাইন—দুই মাধ্যমেই সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সব হল থেকেই নারী শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন।"
তিনি উল্লেখ করেন, "১৪ জুলাই রাতে বেগম খালেদা জিয়া হলের ছাত্রীরা হলের তালা ভেঙে বেরিয়ে মিছিলে যোগ দেয়। অন্য হলের ছাত্রীরাও একইভাবে আন্দোলনে যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপর হামলার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। কেউ লাঠি, কেউ মরিচের গুঁড়ে, আবার কেউ বেডের স্ট্যান্ড হাতে নিয়ে আন্দোলনে নেমে পড়েন।"
হাফসা আরও জানিয়েছেন, "১৬ জুলাই রাতের ক্যাম্পাসে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেডের বিস্ফোরণের শব্দ এবং গ্যাসের প্রভাব মেয়েদের হল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। একই সময়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অস্ত্র নিয়ে ক্যাম্পাসে আসার গুজব ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন রাতেই বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরদিন অনেক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস ছাড়লেও কিছু সাহসী ছাত্রীরা শেষ পর্যন্ত হল না ছাড়ার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। পরে প্রশাসনের নির্দেশের কারণে তাদেরও হল ছাড়তে হয়।"
মন্নুজান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও বর্তমান হল সংসদের সহসভাপতি সুমাইয়া জাহান বলেন, "আন্দোলনের শুরু থেকেই নারী শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। প্রথমদিকে ছোট ছোট দলে কর্মসূচিতে অংশ নিলেও আন্দোলন বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন হল থেকে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে মন্নুজান হলের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। তারা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নয়, বরং ন্যায্য দাবির পক্ষে সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন।"
তিনি আরও জানিয়েছেন, "টিয়ারশেল, হামলা ও সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও নারী শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের স্থান ত্যাগ করেননি। হল ছাড়ার দিনটি ছিল সবচেয়ে কঠিন। পরিবহন সংকট, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতির কারণে অনেকেই নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেননি। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা সাহস, সংহতি ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন।"
লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুন নাঈম তুহিনা বলেন, "নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের বলব, জুলাইকে শুধু একটি স্মৃতি হিসেবে নয়, শিক্ষা হিসেবে ধারণ করতে হবে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে আমরা একটি স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছি। সেই চেতনা ধরে রেখে এমন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠিত হবে।"
সংশ্লিষ্টদের মতে, বড় রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস তখনই পূর্ণতা পায়, যখন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার অবদান সমান গুরুত্বের সঙ্গে নথিবদ্ধ করা হয়। শুধুমাত্র নেতৃত্বের গল্প নয়, সাধারণ নারী শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতাও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তাই রাবির জুলাই আন্দোলনে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিয়ে মৌখিক ইতিহাস, সাক্ষাৎকার ও তথ্যভিত্তিক গবেষণা আগামী প্রজন্মের জন্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারিতে অংশ নেওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ বলেন, "জুলাই বিপ্লব ও গণঅভ্যুত্থানে নারী শিক্ষার্থীরা সম্মুখসারির সংগঠক ও অংশগ্রহণকারী হিসেবে গৌরবময় ভূমিকা পালন করেছেন। তারা শুধু সমর্থনেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন, স্লোগানে আন্দোলনকে বেগবান করেছেন, আহতদের চিকিৎসায় সহযোগিতা করেছেন এবং খাদ্য ও মানবিক সহায়তা দিয়েছেন। এমনকি গ্রেপ্তার সহযোদ্ধাকে ছাড়িয়ে আনা এবং আহতদের সেবাতেও তারা এগিয়ে গেছেন।"
তিনি আরও বলেন, "তবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি এখনো অপ্রতুল। আন্দোলনে তাদের অবদানও অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি। বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা প্রয়োজন।"
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইতিহাস নয়; এটি সাহস, ত্যাগ, প্রতিরোধ এবং মানবিকতারও ইতিহাস। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা সেই ইতিহাসে কেবল সহযাত্রী ছিলেন না, বরং অনেক ক্ষেত্রেই ছিলেন সামনের সারির অংশগ্রহণকারী। সংশ্লিষ্টদের মতে, তাদের অভিজ্ঞতা এবং অবদান যত বেশি নথিবদ্ধ হবে, ততই সমৃদ্ধ এবং পূর্ণতা পাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন