প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঢাকা, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ : ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চলের একটি গ্রামের পাশে বয়ে যাওয়া শান্ত নদীর দিকে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আদিবাসী নেতা ভাগনার কারিপুনা। তার মনে আশঙ্কা, যদি সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়ে এবং সেটি জোয়ারের পানির সঙ্গে তাদের গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
এটি জানানো হয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি’র মাধ্যমে।
কারিপুনার গ্রাম মাঙ্গা, উত্তর ব্রাজিলের আমাপা রাজ্যের সীমান্তবর্তী শহর ওইয়াপোকের কেন্দ্র থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ফরাসি গায়ানার সীমান্তবর্তী এই শহরে গত এক বছর ধরে তেল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এর পেছনে কারণ হলো, ব্রাজিলের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পেট্রোব্রাস এক বছর আগে ওই অঞ্চলের সমুদ্রসীমায় তেল অনুসন্ধান শুরু করেছে।
অগাস্ট মাসে পেট্রোব্রাস জানায়, আমাপা রাজ্যের উপকূল থেকে প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রের একটি কূপে তারা তেলের সন্ধান পেয়েছে।
বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা, যিনি ৪ অক্টোবরের নির্বাচনে পুনর্নির্বাচনের জন্য লড়ছেন, দ্রুত ওই এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি তেলকে ‘ভবিষ্যতের পাসপোর্ট’ হিসেবে অভিহিত করেন।
রাজ্যের রাজধানী মাকাপা থেকে ওইয়াপোতে যেতে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। এর একটি বড় অংশ গর্তে ভরা লাল মাটির রাস্তা। বিভিন্ন জলপথ পার হতে অস্থায়ী কাঠের সেতুও ব্যবহার করতে হয়।
শহরের অনেক রাস্তায় ফুটপাত নেই। দুই পাশে নিচু ভবনগুলোর জরাজীর্ণ চেহারা চোখে পড়ে। তবে একই সঙ্গে বেশ কিছু নির্মাণকাজও চলছে।
লুলার ওপর ‘হতাশ’ আদিবাসী নেতা
দারিদ্র্যপীড়িত শহরটিতে সম্ভাব্য তেলসম্পদ নিয়ে অনেক বাসিন্দা আশাবাদী হলেও কারিপুনা বিষয়টি নিয়ে মোটেও নিশ্চিত নন।
৫৭ বছর বয়সী এই আদিবাসী নেতা বলেন, ‘তেল ছড়িয়ে পড়লে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হব। পানির কোনো সীমান্ত নেই।’
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়লে তা ‘কুরিপি নদীতে পৌঁছে যেতে পারে। নদীটি তার প্রায় ১,৮০০ বাসিন্দার গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে। এতে তিনি ‘বিরাট বিপর্যয়ের’ আশঙ্কা করছেন।
পেট্রোব্রাস জানিয়েছে, তাদের বিশ্লেষণে তেল ছড়িয়ে পড়লে তা উপকূলে পৌঁছানোর ‘সম্ভাবনার কোনো ইঙ্গিত’ পাওয়া যায়নি।
২০২৩-২৪ সালে পেট্রোব্রাসের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এবং বর্তমানে জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সের্নের চেয়ারম্যান জ্যাঁ পল প্রাতেস এএফপিকে বলেন, ‘সমুদ্রে তেল অনুসন্ধানে শূন্য ঝুঁকি বলে কিছু নেই।’
তিনি বলেন, ঝুঁকির সম্ভাবনা কম হলেও এর পরিণতি ‘অত্যন্ত গুরুতর’ হতে পারে।
কারিপুনা বলেন, পরিবেশ ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় নিজেকে সোচ্চার হিসেবে তুলে ধরা প্রেসিডেন্ট লুলার ওপর তিনি ‘হতাশ’।
লুলা বলেছেন, তিনি জীবাশ্ম জ্বালানির পক্ষে নন। তবে তার মতে, বিশ্ব এখনো এগুলো ছাড়া চলতে পারে না এবং তেল থেকে পাওয়া অর্থ পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের অর্থায়নে ব্যবহার করা যেতে পারে।
কারিপুনা বলেন, তেল অনুসন্ধানের প্রভাব তিনি ইতোমধ্যে টের পাচ্ছেন। তার ভাষায়, বিমান ও হেলিকপ্টারের শব্দে পাখি ও বন্যপ্রাণী ভয় পেয়ে দূরে সরে যাচ্ছে।
তার এই উদ্বেগের সঙ্গে একমত জোয়েলসো মেন্দনসা, প্রায় ৪০০ জন ঐতিহ্যবাহী জেলের একটি সংগঠনের সহসভাপতি।
নদীর তীরে খুঁটির ওপর তৈরি একটি ছোট ঘরে জাল মেরামত করতে করতে ৫০ বছর বয়সী মেন্দনসা বলেন, তেল ছড়িয়ে পড়লে কেউ আমাদের মাছ কিনতে চাইবে না।
পেট্রোব্রাস এএফপিকে জানিয়েছে, তারা নাগরিক সমাজ ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে ‘নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে’।
বিমান চলাচল নিয়ে কোম্পানিটি জানিয়েছে, আদিবাসী নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর তারা প্রয়োজনীয় ‘সমন্বয়’ করেছে।
কেউ দেখছেন আশীর্বাদ, কেউ অভিশাপ
কেউ সম্ভাব্য তেলসম্পদকে অভিশাপ হিসেবে দেখলেও জ্যাকুলিন ক্যাডেতে এটিকে ‘ঈশ্বরের দেওয়া সংকেত’ মনে করেন।
৪৫ বছর বয়সী এই ইভানজেলিক্যাল ধর্মযাজক ২০২৫ সালের শেষ দিকে ওইয়াপোতে আসেন। বহু বছর ফরাসি গায়ানা ও ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডে থাকার পর তেলের সম্ভাব্য ‘সুযোগের’ আশায় তিনি শহরটিতে চলে আসেন।
জাতীয় শিল্প পর্যবেক্ষণ সংস্থার এক গবেষণা অনুযায়ী, আমাপা রাজ্যে ৫০ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান’ সৃষ্টি হতে পারে।
তেল উৎপাদন শুরু হলে পেট্রোব্রাসকে যে রয়্যালটি বা রাজস্ব দিতে হবে, তা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জন্যও বড় ধরনের আয় এনে দিতে পারে।
তবে পেট্রোব্রাসের প্রেসিডেন্ট মাগদা শ্যামব্রিয়ার্ড আগস্টে জানান, তেল উৎপাদন শুরু হতে আরও ‘ছয় বা সাত বছর’ সময় লাগতে পারে।
এরই মধ্যে শহরের মেয়র ইনাসিও মনতেইরো মাসিয়েল ভবিষ্যৎ নিয়ে ‘খুব আশাবাদী’। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, অবকাঠামো ও সামাজিক নীতির ক্ষেত্রে শহরটিকে ‘প্রায় শূন্য থেকে শুরু করতে হবে’।
২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, শহরটির প্রায় ২৮ হাজার বাসিন্দার অর্ধেকেরও বেশি ব্রাজিলের দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য দেওয়া বোলসা ফামিলিয়া ভাতা পান।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শহরটিতে নতুন মানুষের আগমন বেড়েছে। মেয়র জানান, পেট্রোব্রাস খননকাজ শুরু করার পর এই প্রবণতা আরও ‘তীব্র হয়েছে’।
তার হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ওইয়াপোকে ৪০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার মানুষ বসবাস করছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন