প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল এবং বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে মাছ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন মৌসুম চলছে। তবে, এর মধ্যেও থামছে না অবৈধ মাছ ও কাঁকড়া শিকার।.
অবৈধভাবে নিষিদ্ধ বিষ প্রয়োগ, পাটা জাল এবং লোহার শিক ব্যবহার করে এক শ্রেণির অসাধু জেলে অবাধে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করছেন বলে অভিযোগ এসেছে। একইসাথে বন বিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে প্রজনন মৌসুমে বন প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এটি সূচিত করছে যে, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ এই কারণে হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সরকার প্রতিবছরের মতো চলতি বছরও সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসের জন্য। এ সময়কালে পর্যটন কার্যক্রম এবং জেলে-বাওয়ালিদের পাস-পারমিটও বন্ধ রাখা হয়েছে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলে ও ব্যবসায়ীদের একটি চক্র বন বিভাগের কিছু অসাধু সদস্যকে উৎকোচ দিয়ে গোপনে বনাঞ্চলে প্রবেশ করে অবাধে মাছ ও কাঁকড়া শিকার করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলে জানিয়েছেন, অমাবস্যা ও পূর্ণিমার সময়ে বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে নির্ধারিত হারে অর্থ দিয়ে তারা বনে প্রবেশ করেন। ব্যবহৃত জাল ও শিকারের ধরন অনুযায়ী উৎকোচের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। তারা বলছেন, অর্থ দিলে নির্বিঘ্নে মাছ শিকার করা যায়, এবং অর্থ না দিলে মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।
স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ এসেছে যে, বনের গহীনে মাছ ধরার সময় নিষিদ্ধ বিষ ব্যবহার করা হচ্ছে, যা মাছের ডিম, পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া কাঁকড়া ধরার জন্য নদীর চরে ‘আটন’ বসাতে গিয়ে নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে সুন্দরীসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা। এতে বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
ফিশ ফার্ম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ফোয়াব) এবং খুলনা কেন্দ্রীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি মোল্লা সামছুর রহমান সাহীন বলেছেন, “প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া নিধন বন্ধ করা না গেলে অচিরেই এ মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ মারাত্মক সংকটে পড়বে। বন বিভাগকে আরও কঠোর হতে হবে। শুধু অভিযান পরিচালনা করেই নয়, অবৈধ শিকারিদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং বন বিভাগের বিরুদ্ধে উঠা দুর্নীতির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক।”
এ বিষয়ে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন, “প্রজনন মৌসুমে বন প্রবেশ ও মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিছু জেলে যে গোপনে বনে প্রবেশ করছে, তাতে অস্বীকার করার কিছু নেই। তবে আগের তুলনায় পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। বন বিভাগের টহল ও অভিযান চলমান রয়েছে এবং ইতোমধ্যে বেশ কিছু নৌকা আটক করা হয়েছে। আমাদের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পরিবেশবিদ এবং বন বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবন বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার এক অন্যতম প্রাকৃতিক ঢাল এবং বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল। প্রজনন মৌসুমে অবৈধ মাছ ও কাঁকড়া নিধন বন্ধে কঠোর নজরদারি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদ ও পরিবেশগত ভারসাম্য দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন