প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার এবং বিপুল রেমিট্যান্সের উৎস। তবে, দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মীদের নির্যাতন, শোষণ, রহস্যজনক মৃত্যু এবং আইনি জটিলতার অভিযোগ বারবার সামনে আসছে। সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে।
এ পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের নেয়া উদ্যোগের বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্স উৎস হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। বিশেষ করে ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সৌদি আরব বাংলাদেশিদের জীবনে নির্ভরতার আরেক নাম। কিন্তু এই দেশে প্রবাসী বাঙালিদের শোষণ ও নির্যাতনের তথ্যও বিস্ময়কর।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ সৌদি আরব থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পেয়েছে, যার পরিমাণ ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় এটি ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্স আয়ের ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ এসেছে সৌদি আরব থেকে।
তবে রেমিট্যান্সের আড়ালে বিভিন্ন সময় সৌদিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর নানামুখী, নিষ্ঠুর, নির্মম ও কঠোর নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসে। এ নিয়ে আলোচনা বা প্রতিকার নেই বললেই চলে। নতুন করে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের অজ্ঞতা প্রশ্ন তুলেছে। প্রবাসীদের নিরাপত্তা বিষয়ে রাষ্ট্রের উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সৌদিতে নারী কর্মীদের শোষণের বিষয়টি শুধু শারীরিক নির্যাতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্মক্ষেত্রে শোষণ, বেতন আটকে রাখা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, খাবার না দেয়া, পাসপোর্ট কেড়ে নেয়া, নিয়োগকর্তার হুমকি এবং আইনি প্রতিকার পেতে জটিলতার মতো নানা অভিযোগ।
তবে দেশটিতে সবচেয়ে বেশি শোষণের শিকার হন নারী কর্মীরা। মানবাধিকার কর্মী ও অভিবাসী অধিকার বিশেষজ্ঞ এম রায়হান কবির বলেন, "এক নারী সন্তান কোলে দেশে ফিরে জানান তার গর্ভে সন্তান ধারণ করেছেন ঠিকই, কিন্তু তিনি জানেন না ওই সন্তান আসলে কার। সৌদি মালিকের, মালিকের ছেলের, মালিকের বন্ধুদের, নাকি মালিকের গাড়ি চালকের?" তিনি জানান, এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে।
ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরিফুল হাসানের অভিযোগ, সৌদি আরব থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে শত শত নারী দেশে ফিরছেন। অনেকে ফিরেছেন লাশ হয়ে। কিন্তু এসব ঘটনার কারণ অনুসন্ধান, তদন্ত, দায় নির্ধারণ কিংবা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেই বললেই চলে।
শরিফুল আরও বলেন, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো দেশ নারী কর্মীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে সৌদি আরবে কর্মী পাঠানো বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমন কঠোর অবস্থান বা কার্যকর প্রতিবাদের নজির নেই। এক দশকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনসহ নানা ধরনের সহিংসতায় শিকার হয়ে ১০ হাজার নারী দেশে ফিরেছেন বলেও জানান তিনি।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। তাদের একটি অংশ নিপীড়নের শিকার। একই সময়ে বিদেশ থেকে দেশে এসেছে নারী কর্মীদের অন্তত ৮০০ মরদেহ।
রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপই প্রশ্নবিদ্ধ
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বলছে, এ বছর জানুয়ারি থেকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর এই ৯ মাসে সৌদিতে মারা গেছেন প্রায় ২ হাজার কর্মী। অন্যদিকে ২০২৫ সালে সৌদি আরবে সাত লাখ ৫০ হাজারের বেশি কর্মী পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। দেশটিতে বসবাস করছেন আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ লাখ বাংলাদেশি।
এত বড় শ্রমবাজার, বিপুলসংখ্যক কর্মী এবং বিপুল রেমিট্যান্সের বিপরীতে প্রবাসীদের সুরক্ষায় নেয়া রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ, দূতাবাসের জনবল, সক্ষমতা ও জবাবদিহিতা এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, "প্রবাসী শ্রমিকেরাই তাদের কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠিয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখেন। অথচ তাদের অনেককেই দূতাবাসে গিয়ে অসহযোগিতা ও দুর্ব্যবহারের মুখোমুখি হতে হয়।" তার অভিযোগ, কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল থাকলেও সাধারণ শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে সেই দক্ষতার যথাযথ প্রয়োগ নেই।
এদিকে প্রবাসীদের নিরাপত্তা বিষয়ে রাষ্ট্রের নেয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, রেমিট্যান্সকে বাংলাদেশ প্রায়ই জাতীয় অর্থনীতির শক্তি হিসেবে উদ্যাপন করে। সেই অর্থ পাঠানো মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষাও রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। তাই নজরুল ও সুইটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রবাসীরা যখন বিচার ও শাস্তির মুখোমুখি হন, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানো কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়? বিশাল শ্রমবাজারের বিষয় বিবেচনা রাখাই কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, না কি প্রবাসীদের প্রাণেরও মূল্য আছে?
প্রবাসীদের নিরাপত্তায় দূতাবাসকে হতে হবে আন্তরিক।
প্রবাসীদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রকে আরও আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বিদেশে বিপদে পড়ার পরই কেবল কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু নয়, বরং আগেই গড়ে তোলা জরুরি কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা। প্রবাসীর পাঠানো অর্থের হিসাব যখন রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তখন প্রবাসীর জীবনের হিসাব সামান্য নয়।
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা তাই কেবল দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যবস্থাপনা, কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং প্রবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিতে রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি ঘিরে বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। শুধু রেমিট্যান্সের প্রবাহ ধরে রাখাই নয়, পেছনে থাকা মানুষগুলোর জীবন ও অধিকার রক্ষায়ও কার্যকর ও প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে মনে করছেন তারা। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাষ্ট্রে স্থাপিত দূতাবাস এবং কর্মীদের আন্তরিক হওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন