প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনিয়ম চিহ্নিত করার জন্য একটি স্বাধীন ‘থার্ড আই’ বা তদারকি সত্তা গঠন করা আবশ্যক। একই সঙ্গে, মানবাধিকারকর্মী, গুম থেকে ফিরে আসা ভুক্তভোগী, সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বিদ্যমান দুর্বল আইন সংশোধন করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন ও কার্যকরী সংস্থায় রূপান্তর করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার, রাজধানীর বনানীতে কেজ ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক আয়োজিত ‘আউট অব দ্য শ্যাডো’ শীর্ষক দিনব্যাপী সেমিনারে বক্তারা এসব দাবি তুলে ধরেন।
সেমিনারে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন মন্তব্য করেন, “কোন ছেলেটি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়ে জামায়াতে পড়ছে, তাকে টার্গেট করে গুম করা হতো। দাড়ি-টুপি পরা মানুষদের তো নির্মমভাবে তুলে নেওয়া হতোই। জুমার নামাজের পর মসজিদ থেকে বের হওয়া তরুণদের বয়স বিবেচনায় আটক করা হতো। দাড়ি-টুপি পরা মানুষকে ‘উগ্রবাদী’ ট্যাগ দেওয়া হতো। আবার দাড়ি-টুপি ছাড়া স্বাধীনভাবে লেখালেখি করা, মতামত প্রকাশ বা প্রশ্ন তোলার কারণে বহু মানুষকে লক্ষ্য করে গুম করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, ‘ওয়ার অন টেরর’-এর অজুহাতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যালয়ে একাধিক বিদেশি দেশের গোয়েন্দাদের অঘোষিত উপস্থিতি ছিল। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তারা এবং কিছু সাংবাদিক উপস্থিত থাকতেন। গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখা, গুমের পর হত্যা করে নদী ও রেললাইনে লাশ ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। রাজনৈতিক বিরোধী, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এবং নারীরাও এর শিকার হয়েছেন। নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন দেখেও বিচারকদের উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে, কখনো আসামিকে এজলাসে না তুলে গাড়িতে রেখেই আদেশ দিতেন।
এ ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আইনি ব্যবস্থার ব্যত্যয় নিরসনে তিনি সুনির্দিষ্ট চারটি সুপারিশ উপস্থাপন করেন। প্রথমত, আইনবহির্ভূত গ্রেপ্তার বন্ধ করে প্রকাশ্যে সাক্ষী রেখে অভিযোগ জানিয়ে আটক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনিয়ম চিহ্নিত করতে একটি স্বাধীন ‘থার্ড আই’ বা তদারকি সত্তা গঠন করা আবশ্যক এবং বিচারকদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম করার জন্য শক্তিশালী কমিশন প্রয়োজন। তৃতীয়ত, বিদ্যমান দুর্বল আইন সংশোধন করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন ও কার্যকরী সংস্থায় রূপান্তর করতে হবে। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক সংস্থায় অভিযোগ জানানোর পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম ও লাগাতার সেমিনারের মাধ্যমে জনসচেতনতা বজায় রাখতে হবে।
সাংবাদিক আবু সুফিয়ান বলেন, “একজন মানুষ যে-ই হোক, তার মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। শেখ হাসিনার শাসনামলে সাংবাদিক সমাজ দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। একদল সরকারি বয়ান প্রচার করত, অন্যদল সত্য প্রকাশের চেষ্টা করত। শেষোক্তরা চাকরি হারাত, হুমকি ও ট্যাগিংয়ের শিকার হতো। একশ্রেণির জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বিচারবহির্ভূত হত্যার পক্ষে ফেসবুকে লিখে বিনিময়ে পদ ও সুযোগ-সুবিধা পেতেন।” তিনি বলেন, সত্য নিজের বাবার বিপক্ষে গেলেও সাংবাদিককে তা তুলে ধরতে হবে এবং রাষ্ট্রকে অনবরত প্রশ্ন করতে হবে। সত্যের পথে থাকতে হবে, চাকরি হারানোর ভয় করা যাবে না।
গুম থেকে ফিরে আসা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী মন্তব্য করেন, জাতিসংঘের অধীনে মানবাধিকারের সুনির্দিষ্ট বৈশ্বিক মানদণ্ড নেই। ফিলিস্তিন বা এশিয়ার ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ পশ্চিমা দেশগুলোর চেয়ে ভিন্ন। অধিকার আদায়ের জন্য প্রথমে দেশের ভেতরে জাতীয় ঐকমত্য, পরে আঞ্চলিক ঐক্য গড়তে হবে। তিনি আরও বলেন, আইনের শাসনের অভাবে এ ধরনের গুম-খুন হয়। যারা এসব কাজ করে, তাদের ঈমান নেই। মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীরা সেনাবাহিনীতে থাকা অবস্থায় অপরাধ করতে পারেনি, কারণ তারা জানে সেখানে আইন কঠোর। তাই যতজন অপরাধ করেছে, তারা সবাই র্যাব, ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ে প্রাক্কলনে যাওয়ার পর অপরাধ করেছে।
গুমের ভুক্তভোগী মুফতি জসীমউদ্দিন রাহমানী বলেন, শেখ হাসিনা ও তৎকালীন ডিবি নিজেদের অপরাধ ঢাকতে জঙ্গি নাটক সাজাত। তার সামনেই ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’ নামে কাল্পনিক সংগঠন তৈরি করে তাকে প্রধান হিসেবে দেখানো হয়, যার বাস্তব অস্তিত্ব বিচারেও পাওয়া যায়নি। সদ্ব্যবহার ও গণজাগরণের মাধ্যমে দাওয়াতি উপায়ে পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সন্ত্রাসের মাধ্যমে ইসলাম কায়েম সম্ভব নয়।
হেফাজত নেতা হারুন ইজহার বলেন, সরকারের পতনের পরও জুলুমের আইনি কাঠামো বহাল রয়েছে। মুফতি আব্দুল হাই, মুফতি শফিক ও মাওলানা শেখ ফরিদসহ বহু আলেম মিথ্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ড নিয়ে কারাগারে রয়েছেন। নিরপরাধদের মুক্ত করতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
কেজ ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ রব্বানীর সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন মাওলানা মীর ইদ্রিস, শের মুহাম্মদ প্রমুখ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন