প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন। ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল ৩টা। সময় টেলিভিশনের দৈনন্দিন ব্যস্ততার মাঝে একবার দেখা করার চিন্তা মাথায় এলো বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী শবনমের সঙ্গে। যার পারিবারিক নাম ঝর্ণা বসাক হলেও তিনি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কোটি দর্শকের কাছে ‘শবনম’ নামেই পরিচিত। তিনি এবার দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি অভিনয় জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে প্রথমবারের মতো তাঁর মাতৃভূমিতে পাচ্ছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা। এই অনুভূতি জানতেই রওনা হলাম তার বাসার দিকে।
বাংলামোটর থেকে বারিধারার দূরত্ব প্রায় ৯ কিলোমিটার। আমার সঙ্গে ছিলেন সময় টেলিভিশনের ভিডিও জার্নালিস্ট শাহিনুর রহমান শাহিন এবং এই আড্ডার আয়োজক, চলচ্চিত্র বিষয়ক সিনিয়র সাংবাদিক অভি মঈনউদ্দিন। তার হঠাৎ সিদ্ধান্তে বিকেলের ব্যস্ত ঢাকা পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম অভিনেত্রীর বাসায়।
কলিং বেলের শব্দ উঠতেই দরজা খুললেন বাসার কেয়ারটেকার। আমাদের বসার জায়গা হলো ড্রয়িংরুমে। বিশ্রাম নিতে নিতে চারপাশে চোখ বুলাতেই চোখে পড়লো সাজানো নানা স্মৃতিচিহ্ন, পুরনো দিনগুলোর ছবিগুলো তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
অপেক্ষার কয়েক মুহূর্ত পরেই এলো সেই কাঙ্ক্ষিত সময়। হাসিমুখে আমাদের সামনে এসে বসলেন বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের একসময়কার তুমুল জনপ্রিয় অভিনেত্রী শবনম। বয়সের ছাপ থাকলেও তার ব্যক্তিত্ব এবং সৌন্দর্যের দীপ্তি আজও মুগ্ধ করে।
কথার শুরুতেই উঠে আসে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা পাওয়ার প্রসঙ্গ। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি জানান, দীর্ঘ ৪০ বছরের অভিনয় জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে নিজের দেশের কাছ থেকে এমন সম্মান পাওয়া তার কাছে এক অন্যরকম অনুভূতি। যদিও নিজের দেশের এমন স্বীকৃতি দেরীতে আসার কিছুটা আক্ষেপ রয়েছে, তবে শবনম বলেন, "অনেক পুরস্কার পেয়েছি, অনেক সম্মানও পেয়েছি। কিন্তু নিজের দেশের এই সম্মাননা আমার হৃদয়ের খুব কাছের।"
আলাপচারিতার এক পর্যায়ে উঠে আসে তার অভিনয় জীবন থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রসঙ্গ। ১৯৯৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘আম্মাজান’। সিনেমার পর আর কোনো সিনেমায় দেখা যায়নি তাকে। কিন্তু কেন?
জবাবে শবনম জানান, ‘আম্মাজান’ ছিল তার অভিনয় জীবনের অন্যতম স্মরণীয় কাজ। ছবিটি মুক্তির পর অসংখ্য চলচ্চিত্রের প্রস্তাব এলেও কোনো চরিত্রই তার মন ছুঁতে পারেনি। এ প্রসঙ্গে অভিনেত্রী বলেন, "অনেক ছবির অফার পেয়েছিলাম। কিন্তু আম্মাজানের পর এমন কোনো চরিত্র পাইনি, যেটা আমাকে অভিনয়ের জন্য আকৃষ্ট করতে পারে। তাই আর সিনেমা করা হয়নি।"
আড্ডা জমতে থাকলে ফিরে যান আরও পেছনের দিনে। অকপটে শোনান চলচ্চিত্রে আসার গল্প, অভিনয়ের শুরুর সময়ের নানা স্মৃতি, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের অভিজ্ঞতা। তার কথায় বারবার ফুটে উঠছিল শিল্পের প্রতি ভালোবাসা আর দর্শকের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা। শবনম বলেন, "নাচ শিখতাম। নাচের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসা। বিখ্যাত এহতেশাম সাহেব বাবাকে বলে সিনেমায় নেয়ার জন্য। বিষয়টি মাকে বললে আমার মা বলেন, ও তো ছেলের মতো, ও তো অভিনয় করতে পারবে না। কিন্তু বাবার বিশ্বাস ছিল যে আমি পারবো। তার ইচ্ছাতেই আমি চলচ্চিত্রে আসি।"
পরবর্তীতে এহতেশাম পরিচালিত ‘এদেশ তোমার আমার’ চলচ্চিত্রের নৃত্যে অভিনয়ের সুযোগ পান শবনম। এহতেশামের পাশাপাশি পরিচালক মুস্তাফিজের নজর কাড়তে সক্ষম হন অতিরিক্ত শিল্পী হিসেবে অভিনয় করেই। ১৯৬১ সালে মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘হারানো দিন’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন শবনম।
পাকিস্তানি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে গুণী অভিনেত্রী বলেন, "উর্দু ছবি করলে পাকিস্তানের বাজারে পৌঁছানো যাবে-এহতেশাম সাহেবের এমন পরামর্শ এবং দেশের চলচ্চিত্রশিল্পের স্বার্থেই ‘চান্দা’ সিনেমায় অভিনয় করি। তখন উর্দু ভাষা ভালোভাবে বুঝতাম না। সংলাপ বাংলায় লিখে নিয়ে উর্দুতে ডাবিং করতাম। ছবিটি পাকিস্তানে মুক্তির পর সুপারহিট হয়। এরপর ‘তালাশ’ সিনেমাতেও অভিনয় করি, সেটিও ব্যাপক সাফল্য পায়। এরপর পাকিস্তান থেকে অসংখ্য সিনেমার প্রস্তাব আসতে থাকে। কিন্তু আমি খুব একটা রাজি হতাম না। এভাবেই প্রায় দশ বছর কেটে যায়। অবশ্য এই দশ বছরে আমি পাকিস্তানি ভাষা শিখে ফেলি।"
শবনম আরও জানান, "আমার স্বামী রবিন আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। প্রথমবার লাহোরে গিয়ে মনে হয়েছিল, পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে হয়তো আমার পক্ষে কাজ করা সম্ভব হবে না। কিন্তু স্বামীর সমর্থনেই আমি আত্মবিশ্বাসী হয়ে যাই। ষাটের দশকে কাজী রিজভানী'র পরিচালনায় ওয়াহিদ মুরাদের বিপরীতে ‘লাদলা’ ছবির ‘সোচা থা পিয়ার না করেংগে’ গানটি অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পায়। ছবিটি সুপারহিট হয়। এরপর সেখানকার প্রযোজক-পরিচালকরা আমাকে নিয়ে একের পর এক সিনেমা নির্মাণ করতে শুরু করেন।"
পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ এবং অভিনেত্রীর ইচ্ছাশক্তির কথা শুনতে শুনতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছিল, তা বুঝতেই পারছিলাম না। দীর্ঘ সময়ের সেই আড্ডায় মনে হয়নি আমরা একজন তারকার সঙ্গে কথা বলছি। বরং মনে হয়েছে পরিবারেরই একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য তার জীবনের গল্প শুনিয়ে যাচ্ছেন। বিদায়ের সময়ও তার চোখে ছিল সেই আন্তরিকতার ছোঁয়া।
বারিধারা থেকে ফেরার পথে মনে হচ্ছিল, আজীবন সম্মাননা হয়তো একজন শিল্পীর অর্জনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। কিন্তু শবনমের মতো শিল্পীদের প্রকৃত সম্মান লুকিয়ে আছে দর্শকের হৃদয়ে, যেখানে তিনি বহু আগেই নিজের জন্য স্থায়ী আসন তৈরি করে নিয়েছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন