প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
একসময় ব্যক্তিগত কম্পিউটারের জগতে বিপ্লব ঘটিয়ে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী হয়ে উঠেছিলেন তিনি। বর্তমানে, মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস মানুষের কল্যাণে নিজের বিপুল সম্পদের প্রায় পুরোটাই ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় রয়েছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত গেটস ফাউন্ডেশন আগামী দুই দশকে বিশ্বস্বাস্থ্য, প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও দারিদ্র্য হ্রাসে ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ২০৪৫ সালের শেষে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ করার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। আজ বুধবার (২৮ অক্টোবর) এই মার্কিন প্রযুক্তি উদ্যোক্তার ৭১তম জন্মদিন।
১৯৫৫ সালের ২৮ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের সিয়াটলে জন্মগ্রহণ করেন উইলিয়াম হেনরি গেটস তৃতীয়, যিনি বিশ্বজুড়ে বিল গেটস নামেই পরিচিত। শৈশব থেকে কম্পিউটারের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। সেই আগ্রহ তাঁকে প্রোগ্রামিংয়ের জগতে নিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়।
সিয়াটলের লেকসাইড স্কুলে পড়ার সময় গেটস কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ পান। সে সময় কম্পিউটার ছিল ব্যয়বহুল এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। স্কুলের কম্পিউটার টার্মিনালে কাজ করতে গিয়ে প্রোগ্রামিংয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে। একই স্কুলে পড়তেন তাঁর ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক অংশীদার পল অ্যালেন। প্রযুক্তি নিয়ে দুজনের আগ্রহ পরবর্তী সময়ে যৌথ উদ্যোগের ভিত্তি তৈরি করে।
১৯৭৫ সালে গেটস ও অ্যালেন মিলে প্রতিষ্ঠা করেন মাইক্রোসফট। তাঁদের লক্ষ্য ছিল কম্পিউটারের জন্য সফটওয়্যার তৈরি করা। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য পণ্য ছিল অলটেয়ার ৮৮০০ কম্পিউটারের জন্য তৈরি বেসিক প্রোগ্রামিং ভাষার সংস্করণ। ব্যক্তিগত কম্পিউটারের ব্যবহার বাড়তে থাকায় সফটওয়্যারের বাজারেও দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটে।
মাইক্রোসফটের উত্থানে বড় ভূমিকা রাখে ব্যক্তিগত কম্পিউটারের অপারেটিং সিস্টেম। ১৯৮১ সালে আইবিএমের ব্যক্তিগত কম্পিউটারে ব্যবহৃত হয় মাইক্রোসফটের এমএস-ডস। পরে বিভিন্ন কম্পিউটার নির্মাতার যন্ত্রেও এ অপারেটিং সিস্টেমের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮৫ সালে উইন্ডোজের প্রথম সংস্করণ প্রকাশ এবং ১৯৯৫ সালে উইন্ডোজ ৯৫-এর উদ্বোধন প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে ওঠে। উইন্ডোজ ও অফিস সফটওয়্যারের বিস্তারের মধ্য দিয়ে কম্পিউটারে দাপ্তরিক কাজ, তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হয়ে ওঠে।
১৯৮৬ সালে মাইক্রোসফট শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। প্রতিষ্ঠানটির দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে গেটসও বিশ্বের অন্যতম পরিচিত প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন। তবে প্রতিষ্ঠানটির বাজারে প্রভাব ও প্রতিযোগিতার ধরন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে একচেটিয়া ব্যবসার অভিযোগ এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিযোগিতা আইনসংক্রান্ত মামলার মুখোমুখি হতে হয় মাইক্রোসফটকে।
২০০০ সালে গেটস মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব ছেড়ে দেন। ওই দায়িত্ব নেন স্টিভ বলমার। গেটস তখন চেয়ারম্যান ও প্রধান সফটওয়্যার স্থপতি হিসেবে কাজ চালিয়ে যান। ২০০৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন দায়িত্ব থেকে সরে এসে জনকল্যাণমূলক কাজে বেশি সময় দিতে শুরু করেন। পরে মাইক্রোসফটের পরিচালনা পর্ষদ থেকেও সরে দাঁড়ান তিনি। বর্তমানে তাঁর কাজের বড় অংশজুড়ে রয়েছে গেটস ফাউন্ডেশন, বিশ্বস্বাস্থ্য এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে উদ্ভাবনের উদ্যোগ।
২০০০ সালে বিল গেটস ও মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস প্রতিষ্ঠা করেন বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, যা বর্তমানে গেটস ফাউন্ডেশন নামে পরিচিত। বিশ্বজুড়ে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করা প্রতিষ্ঠানটির অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে মা ও শিশুর মৃত্যু প্রতিরোধ, সংক্রামক রোগ মোকাবিলা এবং দারিদ্র্য হ্রাস। টিকা, পুষ্টি, কৃষি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা খাতেও অনুদান ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে কাজ করে ফাউন্ডেশনটি।
২০২৪ সালে মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস ফাউন্ডেশন থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর থেকে বিল গেটস প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফাউন্ডেশনটির কার্যক্রমে বিভিন্ন দেশের সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বেসরকারি সংগঠন অংশীদার হিসেবে যুক্ত রয়েছে।
জনকল্যাণে ব্যক্তিগত সম্পদ ব্যবহারের বিষয়েও দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় গেটস। ২০১০ সালে তিনি, মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস ও বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেট মিলে ‘গিভিং প্লেজ’ উদ্যোগ চালু করেন। এর লক্ষ্য বিশ্বের ধনী ব্যক্তি ও পরিবারগুলোকে জীবদ্দশায় অথবা মৃত্যুর পর নিজেদের সম্পদের বড় অংশ জনকল্যাণমূলক কাজে দান করতে উৎসাহিত করা।
পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে এগিয়ে নিতেও উদ্যোগ নিয়েছেন গেটস। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্রেকথ্রু এনার্জি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির উন্নয়ন, গবেষণা এবং সেগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে কাজ করে।
২০২৫ সালের মে মাসে নিজের অবশিষ্ট সম্পদের প্রায় পুরোটাই আগামী দুই দশকে জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয়ের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন গেটস। একই সঙ্গে তিনি জানান, গেটস ফাউন্ডেশন ২০৪৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর কার্যক্রম বন্ধ করবে। তাঁর ঘোষণায় বলা হয়, ২০২৫ থেকে ২০৪৫ সালের মধ্যে ফাউন্ডেশন ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করতে পারে। এ অর্থের মধ্যে ফাউন্ডেশনের বিদ্যমান তহবিল ও গেটসের ভবিষ্যৎ অনুদান অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এটি ইতিমধ্যে ব্যয় করা অর্থ নয়; প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ বাজার পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতির ওপর নির্ভর করবে।
চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি গেটস ফাউন্ডেশন জানায়, ২০২৬ সালে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে তাদের পরিচালনা পর্ষদ। বিশ্বস্বাস্থ্য, টিকা, নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য এবং দারিদ্র্য হ্রাসে কার্যক্রম জোরদার করতেই এ ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে ২০৪৫ সালে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা সামনে রেখে প্রশাসনিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও জনকল্যাণমূলক কাজে অর্থের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বিল গেটসের জীবনের পথচলা প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি জনকল্যাণে সম্পদ ব্যবহারের একটি দীর্ঘ অধ্যায়। ব্যক্তিগত কম্পিউটারের প্রসারে মাইক্রোসফটের ভূমিকা তাঁকে প্রযুক্তির ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা দিয়েছে। এখন তাঁর ঘোষিত দান, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির উদ্যোগ কতটা দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে, সেদিকেও নজর থাকবে বিশ্বের।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন