প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভারতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার ঘটেছে। এই প্রযুক্তি নারীদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার এক অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের এই পরিবর্তন শুধুমাত্র বড় বড় মেট্রোপলিটন শহরগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নারীদের অংশগ্রহণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদম প্রশিক্ষণের জন্য বিপুল পরিমাণ ডেটা লেবেলিং বা অ্যানোটেশনের প্রয়োজন হয়। কেরালার ইনফোকসের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার শিক্ষিত নারীদের জন্য ঘরে বসে বা স্থানীয় স্তরে কাজের বড় সুযোগ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে নারীরা আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছেন এবং তাদের পরিবারকে উন্নত জীবন উপহার দিতে পারছেন।
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডিডব্লিউয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেরালার নারীরাও এই সুযোগের সুফল পাচ্ছেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যের বাসিন্দা রোশনি এম এই সুযোগটি গ্রহণ করেছেন। তিনি রাজ্যের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইনফোকসে শত শত কর্মীর একজন এবং ডেটা অ্যানোটেটর হিসেবে কাজ করছেন।
রোশনি তার চাকরির গুরুত্বকে মাসিক বেতনের বাইরে নিয়ে গেছেন; এটি তাকে আর্থিক স্বনির্ভরতা এবং নিজের জীবনের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছে। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের পাশে দাঁড়াতে তিনি কাজ শুরু করেন।
ওমান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোশনি বলেছেন, ‘আমি এখন নিজেকে একজন স্বতন্ত্র মানুষ মনে করি। আমি আয় করছি, নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি এবং স্বাধীনতা পেয়েছি। আর্থিক স্বাধীনতা সত্যিই আলাদা এক অনুভূতি।’
এআই প্রযুক্তি তৈরির ক্ষেত্রে ডেটা অ্যানোটেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। মেশিনকে বাস্তব জগতের বিভিন্ন বস্তু ও পরিস্থিতি চিনতে শেখানোর জন্য বিপুল পরিমাণ তথ্যকে সঠিকভাবে চিহ্নিত ও শ্রেণিবদ্ধ করতে হয়। স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে সক্ষম গাড়িকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় রাস্তা, গাড়ি, পথচারী, ট্রাফিক সংকেতসহ বিভিন্ন বস্তুকে শনাক্ত করে ডেটায় আলাদা করে চিহ্নিত করতে হয়।
ডেটা অ্যানোটেটররা ছবি ও অন্যান্য তথ্যের ওপর এসব বস্তু চিহ্নিত করে দেন। পরে সেই তথ্য ব্যবহার করে এআই সিস্টেমকে বিভিন্ন বিষয় শনাক্ত করতে শেখানো হয়।
এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে এ ধরনের কাজের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে প্রযুক্তি খাতে সরাসরি সফটওয়্যার প্রোগ্রামিং বা প্রকৌশলভিত্তিক দক্ষতা না থাকা মানুষের জন্যও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
২০১৬ সালে মুজিব কোলাসেরি ইনফোকস প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি কেরালার ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তি খাতের একটি অংশ, যেখানে ভারতের প্রচলিত বড় প্রযুক্তি শহরগুলোর বাইরে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ভারতের প্রযুক্তি শিল্প দীর্ঘদিন ধরে বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ ও পুনের মতো শহরকেন্দ্রিক ছিল। তবে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ব্যবসা ও সেবার বিস্তারের ফলে কেরালার মতো রাজ্যেও ধীরে ধীরে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বাড়ছে।
দেশটির লখনউ, জয়পুর, পাটনা, ইন্দোর এবং কোয়েম্বাটোরের মতো টায়ার-২ ও টায়ার-৩ শহরগুলো এখন এআই প্রতিভার নতুন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। বর্তমানে প্রতি ৫ জন এআই শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ জনই আসছেন এই ছোট শহরগুলো থেকে।
ডেটা অ্যানোটেশনের মতো কাজ নারীদের জন্য বিশেষ সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে শিক্ষিত নারীরা, যারা নানা সামাজিক বা পারিবারিক কারণে আগে প্রযুক্তি খাতে প্রবেশের সুযোগ পেতেন না, তাদের জন্য এ ধরনের চাকরি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে।
বর্তমান সময়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ আগের প্রজন্মের নারীদের তুলনায় অনেক বেড়েছে বলে মনে করেন রোশনি। তিনি বলেন, ‘আমাদের মা কিংবা পরিবার ও পরিচিতদের অন্য নারীদের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, শুধু পড়াশোনা করা বা চাকরি করার জন্যও তাদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। কিন্তু এখন অবকাঠামো অনেক বদলেছে, মানুষের মানসিকতাও পরিবর্তিত হয়েছে।’
তবে এই পরিবর্তনের পরও গ্রামীণ এলাকার নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ ও কর্মপরিবেশে নানা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। অনেক নারী বেতন বা কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতে দ্বিধা করেন। কারণ, চাকরি হারানোর ভয় এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব তাদের অনেক সময় নীরব থাকতে বাধ্য করে।
রোশনি অবশ্য তার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতাকে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক বলে মনে করেন। তিনি জানান, ভালো বেতনের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিমার মতো সুবিধাও তার কর্মজীবনকে আরও নিরাপদ করেছে।
তার কাছে এই চাকরির সবচেয়ে বড় অর্জন হলো নিজের উপার্জনের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ। রোশনি বলেন, ‘আমরা নিজের জন্য আয় করতে পারি, একই সঙ্গে আমাদের পরিবারের জন্যও আরও ভালো জীবন নিশ্চিত করতে পারি।’
এআই শিল্পের দ্রুত বিকাশ তাই শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তনই আনছে না। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মসংস্থানের ধরনও বদলে দিচ্ছে। কেরালার নারীদের জন্য ডেটা অ্যানোটেশনের মতো নতুন কাজ সেই পরিবর্তনেরই একটি উদাহরণ। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রযুক্তি-হাবের বাইরে থাকা নারীদের জন্য এসব কর্মসংস্থান ভবিষ্যতে আরও বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন