প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চট্টগ্রাম, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ : বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি এক দিকে, অন্য দিকে পাহাড়ের সবুজ দেয়াল। পাহাড়ের বুক চিরে ঝরনার স্বচ্ছ পানি নেমে আসছে, কোথাও শান্ত লেকের পাদদেশে, আবার কোথাও বিস্তীর্ণ বালিয়াড়িতে ঢেউয়ের ছন্দ। শতবর্ষী স্থাপনা, ধর্মীয় ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি এবং চা বাগানের সবুজ গালিচা— প্রকৃতির রঙ বদলে দেয় শহরের ব্যস্ততা পেরোলেই।
এটি যেন একই ভূখণ্ডে প্রকৃতির নানারূপের এক বিশাল প্রদর্শনী। চট্টগ্রামের এই প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, এই বৈচিত্র্য পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। পুরো চট্টগ্রামের লুকিয়ে থাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে খুলতে পারে নতুন সমৃদ্ধির দুয়ার, যা দেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
আজ ২৭ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব পর্যটন দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য— ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’। প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী নানা আনুষ্ঠানিকতায় দিবসটি উদযাপিত হয়। এবারের মূল বার্তা হলো ‘প্রযুক্তির ব্যবহার’ এবং পর্যটন খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল রূপান্তরের সম্ভাবনা কাজে লাগানো। দিবসটি উপলক্ষ্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উদ্যোগে আজ থেকে সপ্তাহব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন দিবসটি উদযাপনে আজ র্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, বন্দরনগরী হিসেবে চট্টগ্রামের পরিচিতি দেশের অর্থনীতিতে বহু পুরোনো। অর্থনীতির পাশাপাশি পর্যটনের ক্ষেত্রেও এই জেলার সম্ভাবনা বিস্তৃত। সমুদ্র, পাহাড়, ঝরনা, বন, লেক, দ্বীপ, চা-বাগান, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও ধর্মীয় ঐতিহ্য— সবমিলিয়ে এখানে পর্যটনের বৈচিত্র্য দেশের অন্যান্য গন্তব্যের তুলনায় আলাদা মাত্রা তৈরি করেছে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, ফয়’স লেক, ভাটিয়ারী লেক, বাটালি হিল, বাঁশখালী ইকোপার্ক, মহামায়া লেক, খৈয়াছড়া ঝরনা, বাঁশবাড়িয়া, গুলিয়াখালী ও পারকি সৈকত ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সেগুলোকে ডিজিটাল রূপান্তরের আওতায় এনে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।
ভ্রমণপিপাসুরা বলছেন, চট্টগ্রামের পর্যটনের সৌন্দর্য এটিকে করেছে অনন্য। পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে একদিকে সমুদ্রের বিস্তৃত জলরাশি, অন্যদিকে বন্দরনগরীর কর্মচাঞ্চল্য। সূর্যাস্তের সময় আকাশের রং বদলে যায়, সমুদ্রের ঢেউয়ে পড়ে তার প্রতিফলন। কাছেই কর্ণফুলীর মোহনা। জাহাজের চলাচল, নদী ও সাগরের মিলন এবং উন্মুক্ত আকাশ— সবমিলিয়ে পতেঙ্গা শুধু সৈকত নয়, নগরীর সঙ্গে প্রকৃতির সরাসরি সংযোগ। পতেঙ্গার বাইরেও চট্টগ্রামের উপকূলজুড়ে রয়েছে আরো অনেক সম্ভাবনাময় সৈকত। আনোয়ারার পারকি, সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ও গুলিয়াখালী, বাঁশখালী সৈকত, খেজুরতলা— প্রতিটিরই রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। পর্যটকরা যেদিকেই পা বাড়ান, দৃশ্যপট বদলে যায়, দেখা মেলে নতুন কিছুর। পাহাড়, বন, ঝরনা আর সমুদ্র— সবকিছু যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের বুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা হাজারো ঝরনা অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়দের জন্য একেকটি আলাদা অধ্যায়।
‘চলো চট্টগ্রাম দেখি’ নামক ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানের পরিচালক সাজ্জাতুল ইসলাম তুহিন বাসস-কে জানান, ‘প্রকৃতি চট্টগ্রামকে আপন হাতে সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে, এখানকার সৌন্দর্য অফুরান। স্বাভাবিক চিন্তাধারার বাইরেও এখানে পর্যটন সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন বাঁশখালী ও রাঙ্গুনিয়ার চা-বাগানগুলো শুধু চা উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়; সঠিক ব্যবস্থাপনায় এগুলো হতে পারে কৃষি ও প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন গন্তব্য। উদ্যোগ নিলে চা-বাগানের সারি ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে পর্যটনের সংযোগ তৈরি করা সম্ভব। অন্যদিকে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, হাজারিখিল অভয়ারণ্য কিংবা বারৈয়াঢালা অঞ্চলের ট্রেইলগুলো চট্টগ্রামের প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের আরেকটি সম্ভাবনার কথা বলে। এখানে পর্যটনের সঙ্গে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। কারণ, এ ধরনের পর্যটনের গুরুত্ব এখন আন্তর্জাতিকভাবেও নতুন করে সামনে আসছে। জাতিসংঘের পর্যটন সংস্থা টেকসই গ্রামীণ পর্যটনের ক্ষেত্রে প্রকৃতি সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, অবকাঠামো ও সংযোগ, স্থানীয় পণ্য এবং পর্যটনকে স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।’
তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান এবং পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সংযোগ পয়েন্টে অবস্থিত বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্প সম্প্রসারণের অপার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আগ্রাবাদস্থ নৃ-তাত্ত্বিক জাদুঘর, শতবর্ষ পুরোনো ব্রিটিশ নির্মাণশৈলীর অপূর্ব নিদর্শন আগেকার সার্কিট হাউস ঘিরে গড়ে তোলা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী জিয়া স্মৃতি জাদুঘর, নতুন সার্কিট হাউস, কোর্ট হিলে অবস্থিত শতবর্ষী কোর্ট বিল্ডিং ও প্রশাসনিক ভবন, এক সময়কার আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের হেড কোয়ার্টার খ্যাত রেলওয়ে সিআরবি ভবন এবং চারপাশে সবুজের ছায়াঘেরা নান্দনিক পরিবেশের ফৌজদারহাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত সুদীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ—এসবের প্রতিটিই দেশি বিদেশি ভ্রমণপিপাসু ও ইতিহাস অন্বেষণকারীদের অন্যতম আকর্ষণ হওয়ার দাবি রাখে।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগং (টোয়াক)-এর সভাপতি এবং গো-ট্রিপ-এর স্বত্বাধিকারী রাশিদুল হাসান ইমন বাসস-কে জানান, ‘দেশের মানুষের মধ্যে বেড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে। এক সময় মানুষ শুধু নির্দিষ্ট মৌসুমে বেড়াতে যেত। এখন সারা বছরই সময়-সুযোগে বেড়াতে বেরিয়ে পড়ছেন। সে কারণে পর্যটনের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। চট্টগ্রামে আমাদের সংগঠনের অধীনে ১৮টি অপারেটর রয়েছে, তারা সবাই দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পর্যটকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে একটা নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তারা শহরের কাছাকাছি এলাকায় ডে-লং (দিনব্যাপী) ট্যুর দিচ্ছে, কখনো পরিবার-পরিজন নিয়ে কখনো বন্ধু-বান্ধব মিলে।’
তিনি আরো জানান, তার প্রতিষ্ঠান গো-ট্রিপ গত ৯ বছরে প্রায় ২ হাজার ট্রিপ দিয়েছে অভ্যন্তরীণ পর্যটন স্পটগুলোতে, যার বেশিরভাগই চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে।
পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আবু সুফিয়ান বাসস-কে বলেন, ‘চট্টগ্রামে পর্যটনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো একই অঞ্চলে সমুদ্র, পাহাড়, ঝরনা, লেক ও ঐতিহাসিক স্থাপনার মতো বৈচিত্র্যময় গন্তব্য থাকা। কিন্তু কোনো একটি স্পটে গিয়ে আবার ফিরে আসার বদলে পর্যটক যেন একাধিক গন্তব্য ঘুরে দেখতে পারেন, সেই ধরনের পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলা দরকার। এজন্য প্রত্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা, সড়কের মান, পর্যটকবান্ধব পরিবহন, নির্দেশনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান সরকার দেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চায়। চট্টগ্রামের পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে আমরা আশাবাদী, সরকার এর উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ নেবে।’
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘নগরীর পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে শুধু সৌন্দর্যের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না; পর্যটকদের জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতকে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ প্রয়োজন। ইতোমধ্যে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে সেই ধরনের অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সেখানে পর্যটকদের বসার স্থান, পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, আলোকায়ন, পার্কিং ও শৌচাগারের মতো মৌলিক সুবিধা প্রায়ই নিশ্চিত করা হয়েছে। একই ধরনের সুবিধা বা ব্যবস্থা সব পর্যটন স্পটে নিশ্চিত করা গেলে চট্টগ্রামের পর্যটন আকর্ষণ আরো বাড়বে। চট্টগ্রামকে একটি নান্দনিক, সবুজ, নিরাপদ ও পর্যটনবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।’
একই প্রসঙ্গে মতামত জানতে চাইলে চট্টগ্রাম-৫ আসনের সংসদ সদস্য এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বাসস-কে বলেন, ‘চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম তার ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে দেশি-বিদেশি পর্যটকের কাছে অতুলনীয়। কিন্তু বিগত ১৭টি বছর ফ্যাসিবাদী সরকার এই চট্টগ্রামের সবকিছুকে অবহেলা করেছে, সে কারণে পর্যটন স্পটগুলো নানা ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির শিকার হয়েছে, প্রকৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যায়নি। এ অবস্থায় বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি পর্যটনকেন্দ্র উন্নয়ন না করে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই দেশের প্রাকৃতিক সম্ভাবনার সবটুকু কাজে লাগিয়ে দেশকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে চান। কারণ, এই দেশের প্রকৃতি এবং নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু আমাদের মূল সম্পদ। বর্তমান সরকার দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে চিহ্নিত করে পরিবেশবান্ধব ও টেকসইভাবে উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। চট্টগ্রামের সম্ভাবনাকেও এই বৃহত্তর পরিকল্পনার আওতায় কাজে লাগানো হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন