প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্রসংগঠন ছাত্রশক্তি বরিশাল মহানগর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মারযুক আব্দুল্লাহকে ঘিরে আবারও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষকে একের পর এক মামলায় জড়ানোর অভিযোগের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে মামলা-বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ বরিশাল আদালতে দায়ের করা একটি নালিশি মামলায় মৃত ব্যক্তিদেরও আসামি করায় বিষয়টি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করা ওই মামলায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীসহ মোট ২৪৮ জনকে আসামি করা হয়। তবে অভিযোগের সত্যতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ওঠায় আদালত সরাসরি এজাহার গ্রহণ বা মামলা রেকর্ডের নির্দেশ না দিয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন।
মৃত ব্যক্তিকেও আসামি
মামলার সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, এতে অন্তত চারজন প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতাকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ২০২১ সালে মারা যাওয়া মোহাম্মদ আলী হাওলাদার, ২০২৩ সালে মৃত্যুবরণকারী আবুল ফারুক হুমায়ুন, ২০২২ সালে মারা যাওয়া খন্দকার রেজাউর রহমান রেজা এবং ২০২১ সালে প্রয়াত ইঞ্জিনিয়ার এইচএম হাফিজুর রশিদ শিবলী।
মামলায় দাবি করা হয়েছে, ২২ জুন সন্ধ্যায় তারা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মিছিল ও বৈঠকে অংশ নিয়ে ককটেল, হাতবোমা ও বিস্ফোরক নিক্ষেপ করেন। অথচ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বহু আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন। এ ঘটনায় মামলার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশের বক্তব্যেও মিলছে না অভিযোগ
মামলায় ১০, ১৬ ও ২২ জুন বরিশাল নগরের বিমানবন্দর থানাধীন বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ, মিছিল, সড়ক অবরোধ ও গোপন বৈঠকের অভিযোগ আনা হলেও বিমানবন্দর থানা পুলিশ জানিয়েছে, ওই সময়ে এমন কোনো ঘটনা তাদের নথিভুক্ত হয়নি।
বিমানবন্দর থানার ওসি (তদন্ত) সুমন কুমার আইচ বলেন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তাদের থানার আওতাধীন এলাকায় কোনো কর্মসূচি পালনের তথ্য পুলিশের কাছে নেই।
চাঁদাবাজির অভিযোগ
একাধিক সূত্রের দাবি, আদালতে মামলা দায়েরের আগেই বিভিন্ন ব্যবসায়ী, হাসপাতাল মালিক ও ব্যক্তিকে মামলায় নাম জড়ানোর ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। যারা টাকা দেননি, তাদের অনেকের নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
একই মামলার আসামি নিলয় আহম্মেদ রাব্বি ওরফে রাইডার দাবি করেছেন, মারযুক আব্দুল্লাহ তার কাছে পাঁচ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন। টাকা না দেওয়ায় তাকে মামলার ৬ নম্বর আসামি করা হয়েছে।
এদিকে বিদেশে অবস্থানরত নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বরিশাল জেলা শাখার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রাজিব হোসেন খানও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেন, মামলার কপি আদালতে জমা দেওয়ার আগেই বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে পাঠিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মারযুক আব্দুল্লাহ। তার দাবি, সাক্ষীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মামলায় আসামিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ডাকাতি মামলার আসামি
বিভিন্ন সূত্র জানায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরে সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত হন মারযুক আব্দুল্লাহ। ২০২৫ সালের ৬ জুন পটুয়াখালীর দুমকিতে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে দুই সহযোগীসহ পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। বর্তমানে ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নাগরিক সমাজের ক্ষোভ
মামলায় মৃত ব্যক্তি, বিএনপির নির্যাতিত নেতাকর্মী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে আসামি করায় বরিশালে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, এমন ভিত্তিহীন মামলা বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং সাধারণ মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া
বরিশাল মেট্রোপলিটন আদালতের সরকারি আইন কর্মকর্তা (এপিপি) হাফিজ আহমেদ বাবলু বলেন, মিথ্যা তথ্য দিয়ে মামলা করা এবং মৃত ব্যক্তিকে আসামি করা গুরুতর অপরাধ। আদালত যেহেতু তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রয়োজনে বাদীর বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
পুলিশের অবস্থান
বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুন উল ইসলাম বলেন, মারযুক আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে ডাকাতি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত আছে, তবে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন।
অন্যদিকে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. আশিক সাঈদ বলেন, আদালত যেহেতু তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।
আইনবিদদের মত
আইনবিদদের মতে, আদালতের তদন্তে অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে বাদীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারাসহ সংশ্লিষ্ট আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হলে সেটিও আইনের আওতায় আসতে পারে।
এদিকে পুরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে বরিশালের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে এখন সবার নজর।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন