প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঢাকা, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ : ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করার লক্ষ্যে একটি বৃহৎ উদ্যোগের অংশ হিসেবে বুধবার ৭০০-এর বেশি নিহত সেনার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর তাঁদের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে।
হো চি মিন সিটির রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তাঁদের শেষ শ্রদ্ধা জানান। কিছু মানুষের হাতে সাদা ফুল ছিল, কেউ প্রার্থনা করছিলেন। পোড়ামাটির কফিন, যা ভিয়েতনামের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো ছিল, শোভাযাত্রা করে শহরের উপকণ্ঠে একটি শহীদ সেনা সমাধিক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে যায়।
এ খবরটি হো চি মিন সিটি থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে। সামরিক বাহিনী জানায়, উদ্ধারকৃত ৭৩১ জনের দেহাবশেষ পৃথক ও গণকবর থেকে তোলা হয়েছে। ১৯৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত বাহিনী কমিউনিস্টদের একটি বিদ্রোহ দমন করার সময় এসব যোদ্ধা নিহত হন। শহরের একটি গাছপালাঘেরা জনসাধারণের পার্ক থেকে তাঁদের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়।
লে নগক মাই উয়েন, যিনি তাঁর দাদির নামে নামকরণ করা পার্কটিতে প্রায়ই যেতেন, সেখানে গিয়ে জানতে পারেন যে, ওই পার্কেই তাঁর দাদির দেহাবশেষ সমাহিত থাকতে পারে। সম্প্রতি পার্কটির একটি স্মৃতিফলকের কাছে ধূপ জ্বালানোর পর ৩৬ বছর বয়সী উয়েন এএফপিকে বলেন, ‘এই পার্কে এলে আমি সব সময় এক ধরণের পবিত্রতা অনুভব করেছি।’
তিনি আরও বলেন, কাজটি ‘অত্যন্ত কঠিন’ হলেও তাঁর দাদির দেহাবশেষ খুঁজে পাওয়ার বিষয়ে তিনি ‘দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।’ গত মার্চে শুরু হওয়া ৫০০ দিনের জাতীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে পার্কটিতে খননকাজ চালানো হয়। যুদ্ধের পর থেকে নিখোঁজ থাকা কয়েক লাখ মানুষের সন্ধানে এটিকে ভিয়েতনামের সবচেয়ে বড় উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
জুলাই মাস থেকে কয়েক শত বিশেষজ্ঞ ও সেনাসদস্য পার্কটিতে মাটির বিভিন্ন স্তর খুঁড়ে দেহাবশেষ উদ্ধারের কাজ করছেন। এ কাজে বুলডোজার, খননযন্ত্র ও পানির পাম্প ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে অনেক সময় কাদামাটির মধ্যে হাত দিয়েই খুঁজতে হচ্ছে তাঁদের।
বুধবারের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে দেশাত্মবোধক গান বাজছিল। এ সময় শহরের উপমেয়র নগুয়েন মান কুয়ং বলেন, ‘নিহত সহযোদ্ধাদের সন্ধান অব্যাহত রাখতে কোনো সুযোগ বা পদ্ধতিই আমরা উপেক্ষা করব না।’
সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনুসন্ধান-
কুয়ং বলেন, ‘যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার কারণে এ পর্যায়ে উদ্ধার করা অধিকাংশ সেনার নাম ও তাঁদের আদি নিবাস এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।’ রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সরকার একজন নিহত সেনার পরিচয় প্রকাশ করেছে। তিনি হলেন স্কোয়াড লিডার হুয়িন ভ্যান কুয়েন। ১৯৬৮ সালে যুদ্ধে অংশ নেওয়া এই সেনার দেহাবশেষ লে থি রিয়েং পার্ক থেকে উদ্ধার করা হয়।
জুলাই মাসে তার দেহাবশেষের সঙ্গে পাওয়া নাম লেখা একটি কাগজের টুকরো এবং স্বজনদের ডিএনএ নমুনা মিলে যাওয়ায় তার পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়। ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত যুদ্ধে প্রায় ১২ লাখ ভিয়েতনামি সেনা নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়। এ যুদ্ধে প্রথমে সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স এবং পরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা জড়িয়ে পড়ে।
দেশজুড়ে পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি—এমন সেনাদের ২ লাখ ৩০ হাজার কবর রয়েছে। এ ছাড়া আরও হাজার হাজার সেনার দেহাবশেষ দুর্গম জঙ্গলে, কৃষিজমির নিচে কিংবা সাবেক যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে চাপা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হয়। ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে ৭ হাজার সেনার দেহাবশেষ উদ্ধারের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। উপপ্রধানমন্ত্রী ফাম থি থান ট্রা একে ‘বিশেষ গুরুত্বসম্পন্ন রাজনৈতিক দায়িত্ব, একই সঙ্গে হৃদয়ের গভীর থেকে আসা নির্দেশ’ বলে অভিহিত করেছেন।
যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া প্রতিবেশী দেশ লাওস ও কম্বোডিয়াসহ ভিয়েতনামের বিভিন্ন পুরোনো যুদ্ধক্ষেত্রে অনুসন্ধানে দেড় হাজারের বেশি লোক নিয়োজিত রয়েছেন। তাঁদের পাশাপাশি আরও হাজার হাজার মানুষ তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কাজে যুক্ত আছেন। নিখোঁজ সেনাদের পরিচয় শনাক্তের জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার অশনাক্ত কবর থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি দেহাবশেষের ১৮ হাজার নমুনার ডিএনএ বিশ্লেষণ এবং তাঁদের নিকটাত্মীয়দের জিনগত তথ্য নিয়ে একটি ডেটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে।
প্রকল্পের পরিচালনা দলের সদস্য কর্নেল ত্রিন তুং লাম বলেন, কাজটি সহজ নয়। তবে তাঁর মতে, এই ‘সবচেয়ে বিশেষ ও মানবিক’ উদ্যোগ নেওয়ার উপযুক্ত সময় এখনই। গত সপ্তাহে হ্যানয়ের ডিএনএ শনাক্তকরণ কেন্দ্রে পরীক্ষাগারের কর্মীদের দেহাবশেষ থেকে আলাদা করা হাড়ের টুকরো সাবধানে কাটতে দেখা যায়। ডিএনএ বিশ্লেষণের জন্য নমুনা সংগ্রহ করছিলেন তাঁরা।
কেন্দ্রটির পরিচালক ত্রান তুং থান এএফপিকে বলেন, মারাত্মকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত দেহাবশেষ পরীক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বে প্রথমবারের মতো একটি প্রক্রিয়া উদ্ভাবন ও উন্নয়ন করেছে। আন্তর্জাতিক কমিশন অন মিসিং পারসনসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পাওয়া প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরীক্ষামূলক কর্মসূচি চালানো হয়েছে। এতে ৫৮টি নমুনার মধ্যে ৫৪টি থেকে সফলভাবে জিনগত তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে থান সতর্ক করে দেন, প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ। আর এ কাজে তাঁদের সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে হচ্ছে।
‘শেষ ভরসা’-
থান বলেন, ‘নিহতদের জীবিত স্বজন ও নিকটাত্মীয়দের বয়স বাড়ছে, তাঁরা মারা যাচ্ছেন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের একটি উৎস হারিয়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অন্যদিকে, প্রাকৃতিক পরিবেশে দেহাবশেষের ক্ষয় অব্যাহত রয়েছে।’ এতে ডিএনএ সংগ্রহ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
অনেকের কাছে স্বজনদের খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা আজীবনের সাধনায় পরিণত হয়েছে। ৬৮ বছর বয়সী দোয়ান ভ্যান কং ও তার পরিবারের সদস্যরা ১৯৫০ সালে নিহত তাঁর চাচার পরিণতি জানতে বছরের পর বছর বিভিন্ন সমাধিক্ষেত্রে ঘুরেছেন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। মৃত্যুর সময় তাঁর চাচার বয়স ছিল বিশের কোঠায়।
তাদের ধারণা, ফরাসি সেনাদের অতর্কিত হামলার পর তার চাচাকে বাড়ি থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে একটি গণকবরে সমাহিত করা হয়েছিল। সেখানে কমিউনিস্ট যোদ্ধাদেরও কবর দেওয়া হয়েছিল বলে তাঁরা মনে করেন। কং এএফপিকে বলেন, ‘সন্দেহভাজন ওই স্থানগুলো খননের কোনো সুযোগ ছিল না।’
এখন নিখোঁজ স্বজনদের বিষয়ে উত্তর খুঁজতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগকেই নিজের ‘শেষ ভরসা’ বলে মনে করছেন তিনি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন