প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের পণ্য রপ্তানির সুযোগ সংকুচিত হয়েছে, যা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্কের ফলস্বরূপ। এই পরিস্থিতির কারণে বেইজিং ইউরোপের ওপর ক্রমাগত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে নতুন বাজার খুঁজতে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) চীনের এই নির্ভরশীলতাকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য আলোচনায় নিজেদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ ও চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গত এক বছরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়েছে। এক সময় দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যিক নির্ভরতা বিদ্যমান থাকলেও বর্তমানে অবিশ্বাস, বিরোধ এবং প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে কিছু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ।
দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইউরোপীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক থেকে লাভবান হয়েছে। চীনের ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ইউরোপীয় পণ্যের চাহিদা ছিল ব্যাপক। ইউরোপের ক্রেতারাও তুলনামূলক কম দামে চীনা পণ্য পেয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন। যদিও চীনের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্যে ঘাটতি ছিল, তবুও তা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল।
চীনা সরকার রপ্তানিকারকদের ভর্তুকি দেওয়ার এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক অনিয়মের অভিযোগে ইউরোপীয় দেশগুলো মাঝে মাঝে আপত্তি জানালেও যুক্তরাষ্ট্রের মতো কঠোর অবস্থান নেয়নি। চীনে লাভজনক ব্যবসা পরিচালনাকারী ইউরোপীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করতে চায়নি।
তবে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে মূলত চারটি কারণে। প্রথমত, চীনের ‘মেড ইন চায়না ২০২৫’ কর্মসূচির আওতায় দেশটির উৎপাদনশিল্পের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং পণ্যের মান বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ইউরোপীয় কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামতে শুরু করেছে।
দ্বিতীয়ত, এই কর্মসূচির মাধ্যমে চীনের উৎপাদন সক্ষমতা অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি বেড়ে গেছে। অতিরিক্ত পণ্য বিক্রির জন্য বিদেশি বাজারের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
একই সময়ে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের প্রশাসনের সময় চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বাণিজ্যনীতি দেশটির মার্কিন বাজারে প্রবেশের সুযোগ সীমিত করে দিয়েছে। এর ফলে ইউরোপের বিলাসপণ্য এবং উন্নত যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারকদের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
চীনে এক সময় দ্রুত বাড়তে থাকা ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি এখন কমছে। ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতারাও চীনে বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছে। ২০০৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে চীনে মার্সিডিজের বিক্রি বছরে গড়ে ২৪ শতাংশ, বিএমডব্লিউর ২০ দশমিক ২ শতাংশ এবং অডির ১২ দশমিক ৬ শতাংশ হারে বেড়েছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তা কমতে শুরু করেছে।
২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে চীনে মার্সিডিজের বিক্রি আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ কমে যায়। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত ১২ মাসে বিএমডব্লিউর বিক্রি কমেছে ২৫ শতাংশ।
এদিকে, ইউরোপে চীনা পণ্যের আমদানিও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালে চীন থেকে ইইউর পণ্য আমদানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১২ মাসে বেড়েছে আরও ৮ শতাংশ। এর ফলে চীনের সঙ্গে ইইউর বাণিজ্য ঘাটতি ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকের ৬৬ বিলিয়ন ইউরো থেকে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বেড়ে ১০৩ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ফ্রান্স ও জার্মানিসহ ইউরোপের দেশগুলো চীনের বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দ সতর্ক করে বলেছেন, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ইউরোপের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি মধ্যম প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনশিল্পকে দুর্বল করে দিতে পারে।
তবে, ইউরোপ এবার বেইজিংয়ের ওপর চাপ প্রয়োগে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। চীনা বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতে শুল্ক আরোপের পর ইউরোপে এসব গাড়ি রপ্তানি বছরে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫০ হাজারে সীমিত রাখতে এবং পরবর্তী সময়ে বার্ষিক ৬ শতাংশ হারে বাড়াতে সম্মত হয়েছে বেইজিং। রাসায়নিক পণ্যেও একই ধরনের সীমা আরোপের আলোচনা চলছে।
প্যারিসভিত্তিক জ্যাক দেলোর ইনস্টিটিউটের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাবিষয়ক পরিচালক এলভির ফ্যাব্রির মতে, ইউরোপের সামনে এই সুযোগটি খুব বেশি সময়ের জন্য থাকবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির কারণে চীনের বিকল্প বাজার সীমিত হওয়ায় ইউরোপ এই সুযোগ কাজে লাগাতে চায়। ফলে, বেইজিংয়ের ওপর ওয়াশিংটনের শুল্কনীতির একটি অনাকাঙ্ক্ষিত কৌশলগত সুবিধা পাচ্ছে ইউরোপ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন