প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মো: রনি সিকদার: ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া ইউনিয়নে বরিশাল–পটুয়াখালী–কুয়াকাটা ও বরিশাল–ভোলা মহাসড়ক সংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা ‘প্রিজাইড গ্রীন সিটি’ নামে একটি আবাসন প্রকল্পকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত এই প্রকল্পে প্লট বিক্রির নামে কোটি কোটি টাকার প্রতারণা, কৃষিজমি ও সরকারি খাসজমি দখল, জলাশয় ভরাট, জালিয়াতির মাধ্যমে জমি রেজিস্ট্রি, এক প্লট একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি এবং প্রশাসনের একটি অংশের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম সংঘটিত হয়ে আসছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রিজাইড গ্রীন সিটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মনজুরুল ফরাজী। তার সঙ্গে রয়েছেন ভাইস চেয়ারম্যান মো. নাহিম আকন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফ কাজী, মার্কেটিং ডিরেক্টর এস. এম. রফিকুজ্জামান, পরিচালক হাফেজ মো. জাকির হোসেন, মোহাম্মদ কাইয়ুম ও মো. অহিদুর রহমান প্রিন্স। অভিযোগ রয়েছে, এদের অনেকেই অতীতে এমএলএমভিত্তিক ডেসটিনি গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আবাসন ব্যবসার আড়ালে একই ধরনের বিনিয়োগ ও প্লট বিক্রির মডেল অনুসরণ করছেন।
স্থানীয়দের দাবি, ডেসটিনি-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অভিজ্ঞ হিসেবে পরিচিত তরিকুল ইসলাম বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়মিত ঢাকা থেকে এসে প্রকল্পের কার্যক্রম তদারকি করেন এবং প্লট বিপণন ও সদস্য সংগ্রহে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। যদিও এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই প্রিজাইড গ্রীন সিটি গত ১০ থেকে ১২ বছর ধরে প্রকাশ্যে প্লট বিক্রি করে আসছে। একটি বেসরকারি আবাসন প্রকল্প পরিচালনার জন্য জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষসহ প্রায় ২০ থেকে ২২টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হলেও প্রিজাইড গ্রীন সিটির নামে এমন কোনো অনুমোদন নেই বলে অভিযোগ। ট্রেড লাইসেন্স ও ইউনিয়ন পরিষদের একটি অনাপত্তিপত্র ছাড়া প্রকল্পটির প্রয়োজনীয় অনুমোদনের কোনো নথি নেই বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানিটি অন্যের জমির ওপর নিজেদের লে-আউট পরিকল্পনা তৈরি করে বড় বড় সাইনবোর্ড, আকর্ষণীয় লিফলেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবে প্রচারণা চালিয়ে প্লট বিক্রি করছে। অনেক ক্ষেত্রে অস্তিত্বহীন প্লট দেখিয়ে অর্থ আদায়, একই প্লট একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি, টাকা নেওয়ার পর প্লট বুঝিয়ে না দেওয়া এবং অন্যের মালিকানাধীন জমিকে কোম্পানির সম্পত্তি হিসেবে উপস্থাপন করার অভিযোগও রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, অনেক পরিবার জীবনের সঞ্চয় বিনিয়োগ করেও আজ পর্যন্ত কোনো প্লট বুঝে পাননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী ক্রেতা বলেন, পরিবারের সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে প্লট কিনলেও পরে অফিসে গিয়ে প্লট বুঝে চাইলে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষিজমি, সরকারি খাসজমি, খাল, নালা ও জলাশয় দখল করে বালু ভরাটের মাধ্যমে প্লট তৈরি করা হয়েছে। পরিবেশ ও কৃষিজমি রক্ষার আইন উপেক্ষা করে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফ কাজী গ্রাহকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের পর আত্মগোপনে চলে গেছেন। তবে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রিজাইড গ্রীন সিটির মার্কেটিং পরিচালক এস. এম. রফিকুজ্জামানের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, তিনি শুধু প্লট বিক্রিতেই নয়, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, জমি দখল এবং প্রকল্প পরিচালনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো নলছিটি উপজেলার পূর্বচর দপদপিয়া মৌজার ১৬১ ও ১৬৬ নম্বর খতিয়ানের ৯৫ দশমিক ৫০ শতাংশ জমি নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, জমিটির প্রকৃত রেকর্ডভুক্ত মালিক ছিলেন মোক্তার আলী ফকির। তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিক হন ছেলে মো. হাসমত আলী। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার জন্ম ৭ এপ্রিল ১৯৪৫ এবং তার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ৪২১৭৩১৫৩৭৮০৭৭।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, গত ৩০ মে নলছিটি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে ১৪৬৪ নম্বর সাব-কবলা দলিলের মাধ্যমে একই জমি ‘হাসমত ফকির’ নামে ভিন্ন পরিচয়ের এক ব্যক্তির নামে জাল জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ২৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকায় প্রিজাইড গ্রীন সিটি লিমিটেডের নামে রেজিস্ট্রি করা হয়। ওই পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ ২ জানুয়ারি ১৯৭৫, মায়ের নাম ফুল বানু এবং অন্যান্য তথ্য প্রকৃত মালিকের তথ্যের সঙ্গে মিল নেই বলে অভিযোগ। আইডি নম্বর ৪২১৭৩১৫৩৯০২১৭। এরপরও দলিল রেজিস্ট্রি এবং পরবর্তীতে স্থানীয় এসিল্যান্ড অফিস থেকে নামজারি সম্পন্ন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জন্ম তারিখ ১৯৭৫ সালের ২ জানুয়ারি। আইডি নম্বর ৪২১৭৩১৫৩৯০২১৭। এসব দেখেও যাচাই বাছাই না করেই নলছিটির সাবরেজিস্ট্রার দলিল রেজিস্ট্রি করে দেন।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নলছিটি সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ও এসিল্যান্ড অফিসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, জাল কাগজপত্র যাচাই না করেই দলিল রেজিস্ট্রি ও নামজারি সম্পন্ন করা হয়েছে। ফলে প্রশাসনের একটি অংশের যোগসাজশ ছাড়া এমন ঘটনা সম্ভব নয় বলে তারা দাবি করছেন।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কৃষিজমি, খাসজমি ও জলাশয় দখল এবং প্লট বিক্রির কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করেও কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন রয়েছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে প্রিজাইড গ্রীন সিটির চেয়ারম্যান মনজুরুল ফরাজী, পরামর্শক তরিকুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফ কাজী, মার্কেটিং পরিচালক এস. এম. রফিকুজ্জামান এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকল্পটির বৈধতা যাচাই, জালিয়াতির মাধ্যমে সম্পাদিত দলিল ও নামজারির তদন্ত, সরকারি খাসজমি ও জলাশয় দখলের অভিযোগ অনুসন্ধান, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। চলবে....
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন