প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
অ্যান্টার্কটিকার থোয়াইটস হিমবাহ, যা ‘ডুমসডে গ্লেসিয়ার’ নামে পরিচিত, বিজ্ঞানীদের পূর্ববর্তী অনুমানের তুলনায় দ্রুত গলছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ এই হিমবাহ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পূর্বের হিসাবের প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।
নতুন মডেলের তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র এই হিমবাহের গলনের ফলে ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ দশমিক ২ ইঞ্চি পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে উপকূলীয় অঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাবে বলে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন।
পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকায় অবস্থিত থোয়াইটস হিমবাহ বিশ্বের সবচেয়ে প্রশস্ত হিমবাহ হিসেবে পরিচিত। এটি কয়েক দশক ধরে গলছে এবং পেছাচ্ছে। এর গলনের ফলে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে প্রায় ৪ শতাংশ অবদান রয়েছে। যদি হিমবাহটি সম্পূর্ণরূপে ধসে পড়ে, তবে এর বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দুই ফুটের বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে।
তবে ঝুঁকি শুধু এই হিমবাহের বরফ গলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। থোয়াইটস অ্যান্টার্কটিকার বিশাল বরফস্তরকে আটকে রাখার ভূমিকা পালন করে। এটি ভেঙে পড়লে এর পেছনে থাকা বরফ দ্রুত সমুদ্রে প্রবাহিত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ১০ ফুট পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামি থেকে ফিলিপিন্সের ম্যানিলা পর্যন্ত বহু উপকূলীয় এলাকা হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, আরভাইন এবং নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির গবেষকরা হিমবাহের গলন ও বরফস্তরের পরিবর্তন বোঝার জন্য নতুন একটি মডেল তৈরি করেছেন। এই মডেলে হিমবাহের নিচে সমুদ্রের পানির চলাচল এবং এর ফলে বরফ গলার প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গবেষণাটি সোমবার নেচার কমিউনিকেশন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
হিমবাহের যে অংশ সমুদ্রতল ছেড়ে উঠে ভাসমান বরফস্তরে পরিণত হয়, তাকে গ্রাউন্ডিং লাইন বলা হয়। উপগ্রহের তথ্য থেকে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এ অঞ্চলের নিচে কখনো কখনো কয়েক মাইলজুড়ে বিস্তৃত একটি এলাকা থাকে। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সমুদ্রের পানি সেখানে ঢোকে ও বেরিয়ে যায়। এতে বরফস্তর ওঠানামা করে এবং তুলনামূলক উষ্ণ পানি হিমবাহের নিচে অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এই প্রক্রিয়ায় বরফ দ্রুত গলে।
নতুন মডেলে এই প্রক্রিয়াটি যুক্ত করার ফলে হিমবাহটির সম্ভাব্য গলন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হিসাব আগের চেয়ে বেশি এসেছে। গবেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতা আর না বাড়লেও ২১০০ সাল নাগাদ থোয়াইটস হিমবাহ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ দশমিক ২ ইঞ্চি পর্যন্ত বাড়তে পারে। এটি আগের হিসাবের প্রায় দ্বিগুণ।
হিমবাহের নিচের ভূমি সমুদ্রের দিকে ক্রমে ঢালু হয়ে নেমেছে। ফলে বরফ গলে গেলে উষ্ণ পানির সংস্পর্শে আরো বেশি বরফ আসবে, যা গলনের গতি বাড়াতে পারে। সমুদ্রতলের দুটি উঁচু শৈলশিরা বর্তমানে হিমবাহটিকে আটকে রেখেছে। কিন্তু বরফ গলার কারণে এই বাধা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
গবেষকদের হিসাবে, চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ হিমবাহটি মুজিনো রিজ নামের একটি শৈলশিরা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ৬০ শতাংশ। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে ঢালু সমুদ্রতল ধরে হিমবাহটি দ্রুত পেছাতে পারে এবং পরবর্তী বড় শৈলশিরায় গিয়ে থামতে পারে।
গবেষণাটির প্রধান লেখক ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, আরভাইনের অধ্যাপক এরিক রিগনো বলেন, নতুন হিসাব অনুযায়ী, আগামী কয়েক দশকে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে বন্যার ঝুঁকি ও মানুষের বিপদের আশঙ্কা আগের ধারণার চেয়ে বেশি।
গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না এমন বিজ্ঞানী টেড স্ক্যাম্বোসের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পূর্বাভাস তৈরিতে এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরো গবেষণা দরকার। বিশেষ করে হিমবাহের নিচের অবস্থা সম্পর্কে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি।
ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের সামুদ্রিক ভূ-পদার্থবিদ রবার্ট লার্টারও বলেছেন, হিমবাহের নিচের গ্রাউন্ডিং অঞ্চলে কীভাবে বিভিন্ন প্রক্রিয়া কাজ করে, তা আরো ভালোভাবে জানতে হবে। তার মতে, গবেষণাপত্রে যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, বাস্তবে থোয়াইটস হিমবাহের নিচের পরিবেশ তার চেয়ে বেশি জটিল।
এ বিষয়ে আরো তথ্য সংগ্রহ করতে বিজ্ঞানীরা ২০২৮ সালে হিমবাহের গ্রাউন্ডিং লাইনে গিয়ে যন্ত্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছেন। এসব যন্ত্র দিয়ে হিমবাহের নিচে সমুদ্রের পানি কীভাবে ঢোকে ও বেরিয়ে যায়, তা রেকর্ড করা হবে।
রিগনো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সংবেদনশীল বরফস্তরগুলোর ওপর কী প্রভাব পড়ছে, তা বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরেই জানেন। তবে হিমবাহের নিচের পরিস্থিতি সম্পর্কে সাম্প্রতিক নতুন তথ্য উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পৃথিবীকে উষ্ণ করে এমন দূষণ এখনই কমানো জরুরি। তা সত্ত্বেও অতীতে ঘটে যাওয়া ক্ষতির কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
এএম
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন