প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল, জীবিকা সংকটে জেলে
“২০ দিন ধরে নদীতে যাই আর আই। ২০ দিন পর দুইডা মাছ পাইছি।
নদীতে যাওয়া মানুষের দেনা কইরা, আল্লায় মাছ দিলে দেনা হোদ দিয়া দিমু। কিন্তু নদীতে গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হয়। গাঙ্গে তো যাই আশা কইরা, আল্লায় যদি মাছ না দেয় কিয়ারুম? আমগো তো আর কিছু করার নাই।”
এই কথাগুলো বলছিলেন ভোলার শিবপুরের ভোলার খাল মাছঘাটের ষাটোর্ধ্ব ওয়াদুদ মাঝি।
সম্প্রতি ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর মাছঘাট এলাকায় গেলে দেখা মেলে ষাটোর্ধ্ব জালাল আহম্মদ ও ওয়াদুদ মাঝির। জ্বালানি খরচ পোষাতে না পেরে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার রেখে দাড়ের নৌকায় মাছ শিকারে মেঘনায় যান তারা। তবে ঘাম ঝরানো কষ্টের পরও ইলিশ না পাওয়ায় আয়ের পরিবর্তে তাদের দেনাই বাড়ছে বলে জানান তারা।
এটি শুধুমাত্র জালাল আহম্মদ ও ওয়াদুদ মাঝির সমস্যা নয়, ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ শিকার করা প্রায় সব জেলেরই একই অবস্থা।
মনপুরার উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের তালতলি মাছঘাটের জেলে মো. ফরিদ মাঝি। ৪৫ বছর জীবনের তিন দশকই কাটিয়েছেন মেঘনা নদীতে মাছ শিকার করে। এক সময় অন্যের নৌকায় মাছ শিকার করলেও এখন তিনি একটি মাঝারি আকারের নৌকার মালিক। ওই নৌকায় তিনিসহ সাতজন জেলে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
ফরিদ মাঝি জানান, এত দিন নদীতে মাছ শিকার করে তাদের জীবন ভালোই চলছিল।
তবে চলতি মৌসুমে নদীতে মাছ না পাওয়ায় হতাশায় দিন কাটছে তাদের। তিনি জানান, গত দুই মাস নদীতে মাছ শিকারে গিয়ে নৌকার জ্বালানিসহ তাদের খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। মাছ বিক্রি করে পেয়েছেন ৬৪ হাজার টাকা। দুই মাসে একেকজন জেলে ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা করে পেয়েছেন, যা একজন শ্রমিকের এক দিনের মজুরি।
মো. ফরিদ মাঝি বলেন, “প্রতিদিনই মাছের আশায় নদীতে যাই, কিন্তু দিন শেষে খালি হাতে ফেরা লাগে। এভাবে চলছে গত দুই মাস ধরে। মেঘনায় ইলিশের ভরা মৌসুম চললেও নদীতে মাছের তেমন দেখা নাই। দিন দিন আড়ত মালিকের দাদনের বোঝা বাড়তে বাড়তে ৯ লাখে এসে দাঁড়িয়েছে। এনজিওর ঋণ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতে গিয়ে অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়ছি।”
মনপুরার ফরিদ মাঝির মতো চরম হতাশা নিয়ে দিন কাটছে ভোলার দুই লক্ষাধিক জেলের। ভরা মৌসুমেও এমন সংকটের কারণ খুঁজে পাচ্ছে না স্থানীয় মৎস্য বিভাগ; সংকট নিরসনে বিকল্প উপায় জানা নেই তাদের।
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ভোলায় মোট নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা এক লাখ ৬৮ হাজার। এর মধ্যে সমুদ্রগামী জেলে ৬৪ হাজার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় মোট ইলিশ পাওয়া গেছে এক লাখ ৮১ হাজার ৩৪২ মেট্রিক টন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৭৯ হাজার ৩৩১ মেট্রিক টনে। এই দুই বছরে এক দশমিক ১২ শতাংশ ইলিশ কম পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া ২০২১-২২ অর্থবছরে পাওয়া ইলিশের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৭৮ হাজার ৯০৫ মেট্রিক টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এক লাখ ৭৯ হাজার ৯৯৪ মেট্রিক টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এক লাখ ৬৮ হাজার ৬৭৪ মেট্রিক টন। এই পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে সবচেয়ে বেশি ইলিশ পাওয়া গেলেও পরে তা কমেছে।
সূত্র জানায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এক লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ইলিশের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কী পরিমাণ ইলিশ পাওয়া গেছে, তা জানাতে পারেনি স্থানীয় মৎস্য বিভাগ।
জেলার বিভিন্ন মাছঘাট ঘুরে জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আষাঢ়-শ্রাবণ মাস থেকে ইলিশের ভরা মৌসুম শুরু হলেও ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশের চরম আকাল চলছে। গত দুই-তিন মাস ধরে কাঙ্খিত ইলিশ না পেয়ে জীবন-জীবিকার সংকটে পড়েছেন জেলে ও মৎস্যজীবীরা। উচ্চ মূল্যের জ্বালানি পুড়ে নদী থেকে ফিরছেন খালি হাতে। এতে দিন দিন বাড়ছে দাদনের বোঝা। তবে এখনও আশায় বুক বেঁধে নদীতে নামছেন ইলিশ শিকারীরা।
ভোলা ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সিমিতির সভাপতি মো. এরশাদ ফরাজি জানান, জেলেরা প্রতিবছর এই সময়ে আশা করে ভরপুর ইলিশ মাছ পাবে। কিন্তু এ বছর ভরা মৌসুমেও ইলিশের দেখা নেই। জেলেরা নদীতে গিয়ে খালি হাতে ফিরে আসছে। এতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেক কষ্টে দিন পার করছেন তারা।
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন বলেন, ইলিশ সাগর ও নদী—দুই জায়গায়ই চলাচল করে। নদীতে অসংখ্য ডুবোচরের কারণে তাদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ও অবৈধ জালসহ নানা কারণে ইলিশ কমে যাচ্ছে। তার পরও আরো এক-দুই মাস অপেক্ষা করে দেখতে হবে। তাহলে আসল চিত্রটা বোঝা যাবে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তায়েফা আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, নদীতে ইলিশ কম পাওয়ার পেছনে সরাসরি কোনো একটিকে নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। এমনিতেই আমার নদীতে ডুবোচরের পাশাপাশি নদীর দূষণের কথা বলছি। এ সময় নদীতে ইলিশ আসার কথা, আমরা আরেকটু অপেক্ষা করি।
তায়েফা আহমেদ বলেন, সামনে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাস ইলিশের ডিম ছারার সময়। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ইলিশের আসল চিত্রটি বলা যাবে। তিনি বলেন, বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হচ্ছে। তাই ইলিশ কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে গবেষণা চলছে, মাঠ পর্যায় থেকে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। এখনই কারণ হিসেবে কোনো কিছুকে নির্দিষ্ট করা যাবে না
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন