প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অন্যতম শক্তিশালী ও প্রভাবশালী বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘জায়ান্টস ব্রিগেড’। এই ব্রিগেড বাব আল-মান্দেব প্রণালীর আশেপাশে হুথিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করে আসছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে ইয়েমেনের নিয়মিত সামরিক বাহিনীর অংশ নয়, তবুও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও আঞ্চলিক শক্তির সহায়তায় গড়ে ওঠা এই বাহিনীর উত্থান এবং তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ইয়েমেনের যুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইয়েমেনের এই প্রভাবশালী বাহিনী এবং দেশটির চলমান সংঘাতের বিভিন্ন দিক নিয়ে সম্প্রতি একটি তথ্যবহুল প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম মিডল ইস্ট আই।
প্রতিবেদনে হুথিদের উত্থান এবং জায়ান্টস ব্রিগেডের জন্ম প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯০-এর দশকে উত্তর ইয়েমেনে হুথি আন্দোলন গড়ে ওঠে। মূলত শিয়া ইসলামের একটি শাখা ‘জায়েদী ইসলাম’কে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই ইরানের সাথে যোগসাজশ এবং শতাব্দী প্রাচীন জায়েদী ইমামতের মতো ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে।
সরকারের সাথে দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহর সহায়তায় রাজধানী সানা দখল করে নেয় হুথিরা। এরপর ২০১৫ সালের শুরুর দিকে তারা দক্ষিণের এডেনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ঠিক সেই বিশৃঙ্খল ও সংকটময় মুহূর্তে হুথিদের প্রতিহত করার লড়াইয়ে জন্ম নেয় জায়ান্টস ব্রিগেড।
জায়ান্টস ব্রিগেড আসলে কারা এবং তাদের নেতৃত্ব? মূলত ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর সালাফি যোদ্ধাদের নিয়ে এই ব্রিগেড গঠিত হয়েছে। এর নেতৃত্বে রয়েছেন আবদ রহমান আবু জারা আল-মুহারামি, যিনি হুথিদের শক্তঘাঁটি সাদায় অবস্থিত দারুল হাদিস মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছিলেন। যুদ্ধের আগে তার কোনো সামরিক অভিজ্ঞতা না থাকলেও আমিরাতের অস্ত্র প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নে তার যোদ্ধারা ইয়েমেনের অন্যতম প্রধান হুথিবিরোধী শক্তিতে পরিণত হন।
২০১৭ সালের মধ্যে এই বাহিনী পশ্চিম উপকূলে অভিযান চালিয়ে হুথিদের কাছ থেকে বড় এলাকা দখল করে নেয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে লোহিত সাগরের কৌশলগত বন্দর হোদায়দার উপকণ্ঠে পৌঁছালেও জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তির কারণে তাদের অগ্রগতি থেমে যায়। এরপর ২০২২ সালে শাবওয়ায় মোতায়েন হয়ে তারা মারিবের দিকে অগ্রসর হয়।
কার জন্য যুদ্ধ করছে জায়ান্টস ব্রিগেড? মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য একাধিক বাহিনী গড়ে উঠলে ও আঞ্চলিক জোট ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের কারণে হুথিবিরোধী শিবির সবসময় বিভক্ত ছিল।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আনুষ্ঠানিকভাবে একই জোটে থাকলেও তারা মাটিতে আলাদা বাহিনীকে সমর্থন দিত। সৌদি আরব সরকারের পক্ষে থাকলেও আমিরাত দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের’ (এসটিসি) সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে।
জায়ান্টস ব্রিগেড ধীরে ধীরে দক্ষিণাঞ্চলীয় এই শিবিরের অংশ হয়ে ওঠে। তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে, যখন সৌদি আরব হস্তক্ষেপ করে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এডেনের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে বাধ্য করে। এর মাধ্যমে হুথিবিরোধী শিবির অনেকটা সৌদি প্রভাবের অধীনে আসে।
অক্টোবরে সরকারি বাহিনীর সাথে মিলে এই বাহিনী ‘অপারেশন ইয়েমেন্স ডন’ নামে একটি বড় আক্রমণ শুরু করে। পশ্চিম উপকূলে তারা কিছু সামরিক সাফল্য পেলেও কৌশলগত শহর তায়েজের পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। সেখানে হুথিরা শহরটির একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট দখল করে অবরুদ্ধ করে রেখেছে, যেখানে আট লাখেরও বেশি মানুষ আটকা পড়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জায়ান্টস ব্রিগেডের মতো শক্তিশালী বাহিনী থাকা সত্ত্বেও ইয়েমেনে কোনো পক্ষই এককভাবে বিজয়ের কাছাকাছি নেই। একই সাথে এটি হুথিবিরোধী শিবিরের অভ্যন্তরীণ অনৈক্য এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে স্পষ্ট করে তোলে, যা আগামী দিনে ইয়েমেনের যুদ্ধ ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন