প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে নতুন বিমান হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেছে, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর বাস্তবায়িত হতে পারে। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন কর্মকর্তাদের এবং আলোচনার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সূত্রে এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি জোরদার হওয়ার সাথে সাথে দুই দেশের সামরিক বাহিনী যৌথ মহড়া বাড়িয়েছে। হামলার কৌশল হিসেবে ইরাকের আকাশসীমায় যুদ্ধবিমান উড়ানো হচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই সপ্তাহে ইসরায়েল সফর করে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে নতুন আক্রমণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো, পারমাণবিক স্থাপনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির কারখানা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, বড় আকারের হামলা ইরানের অর্থনীতিকে ধসের মুখে ঠেলে দিতে পারে, যা তাদের কূটনৈতিক আপস করতে বাধ্য করবে।
তবে, নতুন যুদ্ধ শুরু করে পূর্বের তুলনায় বেশি সফলতা পাওয়া যাবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম পর্যায়ের তীব্র আক্রমণ বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলেছে।
এছাড়া, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নতুন হামলার অনুমোদন দেবেন কিনা, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। তিনি চলতি বছর একাধিকবার বড় সামরিক অভিযানে ফেরার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। এমনকি চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন আক্রমণের চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল, তখনও তিনি তা স্থগিত করেন।
এই প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়া কর্মকর্তারা সামরিক পরিকল্পনার বিষয়টি গোপনীয় রাখতে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
অন্যদিকে, ইরানও পাল্টা জবাব দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছে। তারা জানিয়েছে, আঞ্চলিক বাণিজ্যিক জাহাজ, জ্বালানি অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার এবং সমুদ্র তলদেশের ইন্টারনেট ক্যাবলগুলোকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য হলো, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে এবং কোনো নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্র আগামী নভেম্বরের শুরুর মধ্যে তাদের সামরিক সরঞ্জাম প্রস্তুত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, তবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।
মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ দাবি আদায়ের জন্য যুদ্ধের ভয়কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। তবে ইরানের আলোচকরা পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি হননি।
কিছু মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারী বিশ্বাস করেন যে, তিন দিনের একটি তীব্র সামরিক অভিযান ইরানের অর্থনীতিকে এত বড় ধাক্কা দেবে যে, তারা অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে। তবে অতীতে মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের পতনের ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, যা সত্য হয়নি।
বাইডেন প্রশাসনের পেন্টাগনের শীর্ষ মধ্যপ্রাচ্য নীতি কর্মকর্তা ডানা স্ট্রুল বলেন, "এখন পর্যন্ত চালানো প্রথাগত সামরিক অভিযান, কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন নৌ অবরোধের কোনোটিই ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে অর্থপূর্ণ আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে পারেনি।"
তিনি আরও যোগ করেন, ট্রাম্প কিংবা নেতানিয়াহু- কেউই একটি সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি যে, এই ক্রমবর্ধমান অস্থির অঞ্চলে আরও যুদ্ধ কীভাবে মূল সমস্যার সমাধান করবে।
এদিকে, আগামী ২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি নির্বাচন এই সামরিক পরিকল্পনাকে কিছুটা জটিল করে তুলতে পারে। নেতানিয়াহু যদি হেরে যান, তবে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং নতুন করে যুদ্ধ ঘোষণা করা তাঁর জন্য কঠিন হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, নেতানিয়াহু মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ হামলার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক বিরোধীদের একত্রিত করে একটি 'জাতীয় জরুরি সরকার' গঠনের চাপ দিতে পারেন, যাতে তাঁর ক্ষমতার মেয়াদ দীর্ঘায়িত হয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের পর নেতানিয়াহু একটি ঐক্যবদ্ধ সরকার গঠন করেছিলেন এবং জাতীয় নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত নিতে বিরোধীদের যুদ্ধকালীন ক্যাবিনেটে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
তিনি একটি বিস্তৃত জরুরি সরকার গঠনের আহ্বান জানাতে এটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন, তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের গভীর সন্দেহের মুখোমুখি হতে হবে," বলেন ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাজাল মুয়ালেম।
তিনি আরও বলেন, "ইরান যদি নিজে থেকে আগে আক্রমণ করে তবে তা ভিন্ন কথা, কিন্তু নিজে থেকে উদ্যোগ নিয়ে আক্রমণ চালানো তাঁর জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।"
কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি মাসেই ট্রাম্প অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—এমন একটি ক্ষীণ সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মার্কিন নির্বাচনের আগে তিনি যুদ্ধ শুরু করবেন না বলে মাসের শুরুতে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেই রাজনৈতিক কারণে এবং অন্যান্য কারণে তিনি সম্ভবত নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন।
আগামী নভেম্বরের শুরু ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ সামরিক বহর, যার মধ্যে তিনটি যুদ্ধবিমানবাহী জাহাজ, হাজার হাজার মেরিন সেনা, ফাইটার জেট এবং স্পেশাল অপারেশনস ফোর্সেস রয়েছে, পুরোপুরি প্রস্তুত হতে পারছে না। তাছাড়া মার্কিন সামরিক বাহিনী রাতের আঁধারে আক্রমণ করতে পছন্দ করে এবং আগামী মাসের শুরুতে ইরানে রাতের দৈর্ঘ্য আরও বৃদ্ধি পাবে।
যুদ্ধটি বড় আকারের আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলেও মারাত্মক আশঙ্কা রয়েছে। সউদী আরবে ইরান-সমর্থিত হুথি মিলিশিয়াদের হামলা অব্যাহত থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর সেখানে কর্মরত অপ্রয়োজনীয় সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবারকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রশাসন কোনো অস্তিত্বশীল বা সম্ভাব্য সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে মন্তব্য করে না। তিনি আরও যোগ করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব ধরনের পথ খোলা রাখছেন যাতে ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে।
সামরিক পরিকল্পনাকারীদের মতে, নতুন এই হামলায় শোধনাগার এবং তেল অবকাঠামো এড়ানো হতে পারে, কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তেলের দাম বা গ্যাসের দাম আরও বাড়াতে চান না।
তবে সূত্র মতে, দুই দেশের সামরিক বাহিনীই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর বড় ধরনের আক্রমণের নকশা তৈরি করছে। এর মধ্যে তাদের লক্ষ্য হতে পারে 'পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন' বা 'কোহ কোলং', যা ইরানের একটি গভীর ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তিনি পিকঅ্যাক্স ধ্বংস করতে ২২,০০০ পাউন্ড ওজনের 'মাদার অব অল বম্বস' (এমওএবি) বোমার ব্যবহার করার বিবেচনা করছেন। 'সব বোমার মা' ডাকনামের কারণে ট্রাম্প এই অস্ত্রটির প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট।
কিন্তু অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই 'মোয়াব' বোমাটি মাটির ওপরে বিস্ফোরিত হয়ে বিশাল এলাকা জুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, ফলে গ্রানাইট পাথরের গভীরে অবস্থিত পিকঅ্যাক্সের মতো ভূগর্ভস্থ স্থাপনা এটি ধ্বংস করতে পারবে না। এছাড়া এটি বহনের জন্য ধীরগতির ‘এমসি-১৩০' পরিবহন বিমান প্রয়োজন, যা ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সহজ লক্ষ্যে পরিণত হতে পারে।
চলতি মাসের শুরুতেই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র প্রায় আক্রমণের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্তু দুই দেশের বিমান বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রাখার পরও শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প আক্রমণ স্থগিত করেন। বারবার আক্রমণের পরিকল্পনা করা এবং শেষ মুহূর্তে ট্রাম্পের পিছিয়ে আসার সিদ্ধান্তের ফলে সামরিক পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে তীব্র অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে বলে জানান এক মার্কিন কমান্ডার।
যুদ্ধের প্রতিটি ধাপে ইরানের নেতৃত্ব আরও বেশি কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। তারা নিশ্চিত যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের সরকারের পতন ঘটানো।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এখনও মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের কাছে এক রহস্যময় চরিত্র। অনেক কর্মকর্তার মতে, যুদ্ধের শুরুতে নিহত তাঁর পিতার মতো তিনি ততটা শক্তিশালী নন এবং ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কট্টরপন্থীরাই এখন মূল নীতি নির্ধারণ করছেন।
ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, তারা আমেরিকানদের এই সামরিক পরিকল্পনার বিষয়ে সতর্ক এবং নিজেরাও নতুন কৌশল ও লক্ষ্যবস্তু প্রস্তুত করছেন।
তেহরানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক পেইমান সালেহি বলেন, যদি পিকঅ্যাক্স স্থাপনায় হামলা চালানো হয়, তবে ইরানের পাল্টাহামলার অংশ হবে সউদী আরবের অরামকোসহ বড় বড় তেল শোধনাগারগুলোতে আঘাত করা, যেন তা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এই যুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে যে ট্রাম্পকে চাপে ফেলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তেল ও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেওয়া, কারণ এটি সরাসরি আমেরিকান জনগণের ওপর প্রভাব ফেলে, বলেন সালেহি।
ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিশ্লেষক ও কৌশলবিদ মাহদি মোহাম্মদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন যে, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আমেরিকা যুদ্ধ গুটিয়ে নেবে-এমন চিন্তা একটি "দিবা স্বপ্ন"। যুদ্ধ কখন শেষ হবে তা ইরান নির্ধারণ করবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প বলেছিলেন যুদ্ধ মাত্র দুই সপ্তাহ স্থায়ী হবে।
"আমাদের আক্রমণগুলো এবার আরও তীব্র, সৃজনশীল এবং ভিন্ন মাত্রার হবে," বলেন মোহাম্মদ। "আমরা সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী এবং আমাদের শক্তিশালী পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই তৈরি রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন