প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইরান যুদ্ধে চীন-রাশিয়ার কৌশলগত নীরবতা কি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আত্মসমর্পণ?
মধ্যপ্রাচ্য আজ কেবল একটি যুদ্ধক্ষেত্র নয়; এটি বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পরীক্ষাগার। এখানে যে সংঘাত চলছে, তার ফলাফল শুধু একটি রাষ্ট্র ইরানের বিজয় বা পরাজয় নির্ধারণ করবে না—নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক দশক বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে যাবে-দীর্ঘদিনের এক মেরু ব্যবস্থায় বহাল থাকবে নাকি বহুমেরু ভিত্তিক ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থার দিকে যাবে-ফলাফল নির্ধারণি যুদ্ধ।
ইরান যুদ্ধ শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের ইরানের বিপক্ষে কিংবা ইরান ধ্বংসের যুদ্ধ নয়, এটি সম্ভাব্য পরবর্তী সুপার পাওয়ার চীন ও রাশিয়ার নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা গঠনের পথে এগিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত বাধা দানের একটি যুদ্ধ। যেখান থেকে চীনের প্রাণ ভোমরা জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে চীনকে জ্বালানি শক্তিতে দুর্বল করা এবং চীনের দুর্বলতার কারণে ধীরে ধীরে বন্ধু প্রতিম রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাও বন্ধ করা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি চীন ও ইরানকে দুর্বল করতে পারলে রাশিয়ার বিপক্ষেও ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারবে।
কাজেই বর্তমান ইরান যুদ্ধের পরিস্থিতিতে চীন ও রাশিয়া যদি কূটনৈতিক কারণে মুখে ঘোমটা দিয়ে কুলুপ এঁটে বসে থাকে তাহলে তাদেরকে আরো দীর্ঘকাল জঙ্গলের শাসন মেনে নিতে হবে এটা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। সুতরাং তারা বসে থাকবে নাকি প্রকাশ্য অবস্থান নেবে তা তাদের নিজস্ব ব্যাপার।
সমালোচকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব এই অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি রাজনীতি এবং কৌশলগত ভারসাম্যে গভীর প্রভাব ফেলেছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন থেকেই বিশাল বাজেটের অর্থ ও সামরিক সহায়তা দিয়ে ইজরায়েলের মাধ্যমে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একটি অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছে। আবার অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দাবি করে, তাদের উপস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মিত্রদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়। এই দুই বিপরীত বয়ানের মধ্যেই বর্তমান সংকটের বাস্তবতা নিহিত। ইরান, চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া কর্তৃক একমেরু কেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার ভেঙে যদি বহু মেরু বিশ্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য থাকে,, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—চীন ও রাশিয়া কি কেবল বিবৃতি দিয়েই তাদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে? নাকি ইরানের পাশে কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের আরও দৃশ্যমান কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক সামরিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে?
ইরান আজ শুধু একটি রাষ্ট্র নয়; এটি এমন একটি আঞ্চলিক শক্তি, যার অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। ফলে ইরানকে ঘিরে যে কোনো সংঘাতের প্রভাব জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক বাণিজ্য, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে চীন ও রাশিয়ার নীরবতা বা সংযত অবস্থানকে কেউ কেউ কৌশলগত ধৈর্য হিসেবে দেখেন, আবার অন্য বিশ্লেষকেরা এটিকে ভূরাজনৈতিক দ্বিধা হিসেবে মূল্যায়ন করেন। কারণ, যদি তারা সত্যিই বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নেয়, তবে সেই অবস্থান কেবল বক্তব্যে নয়, কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন—এমন যুক্তিও রয়েছে। চীন এযাবৎকাল পর্যন্ত সব সময় তারা সরাসরি কোন সংঘাত কিংবা কোন দেশের রাজনৈতিক সরকার বদলে হস্তক্ষেপ করেনি যে কারণে এশিয়ায় তারা ইতিমধ্যে অনেক সুযোগ হারিয়েছে। মধ্যপ্রদেশের বাস্তবতাও তার থেকে ভিন্ন নয় যদি ইরান যুদ্ধেও চীন এখনো তেমন মধ্যপন্থা নীতি অবলম্বন করে তাহলে ভবিষ্যৎ তাদের জ্বালানি চাবিকাঠি হয়তো হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে যদি ইরান কোন কারণে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ব্যর্থ হয়। এই প্রভাবটি রাশিয়ার ক্ষেত্রে হয়তো চীনের পরে পড়বে কিন্তু সেটিও কম নয়।
ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে বড় শক্তিগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে—তারা কি ঘটনাপ্রবাহকে দূর থেকে দেখবে, নাকি নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা নেবে। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটও সেই ধরনের একটি মুহূর্ত। যাতে চীন ও রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি ক্ষমতার বহু মেরুকরণ ও জ্বালানি শক্তির বিশাল এক স্বার্থ নিহিত রয়েছে, যেখানে ইরানের শক্তি ধ্বংস হওয়া মানেই পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হবে চীন ও রাশিয়া।
তবে এটিও মনে রাখা জরুরি, প্রকাশ্য সামরিক সমর্থন বা সংঘাতের বিস্তার আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে ভেবে যদি তারা চুপ করে বসে থাকে তাহলে নিকট ভবিষ্যতের জন্য তাদেরকে পশ্চিমা সুপার পাওয়ার এর সাথে নিজেদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে হতে পারে। তাই হরে আগুন লাগার আগেই যদি সে আগুন নিভিয়ে ফেলা না যায় বা আগুনের সেই শক্তিকে দমন করা না যায় তাহলে তা যে কোন সময় তাদের নিজেদের ঘর পুড়তে ধেয়ে আসবে । যে কোনো পদক্ষেপের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আইন এবং সংঘাতের বিস্তার রোধ তাতে অনেক সময় প্রয়োজনে শক্তি প্রদর্শনও করতে হতে পারে।
আজকের প্রশ্ন তাই এই যুদ্ধ শুধু ইরানের বিরুদ্ধেই নয়, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেরও নয়। প্রশ্ন হলো—বিশ্ব কি আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও সংঘাতময় পথে এগোবে, নাকি আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক সহযোগিতা ও ভারসাম্যের নতুন কাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম হবে?
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন