প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
৩৫ বছরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখলের অভিযোগ, আতঙ্কে বাজারের ব্যবসায়ীরা; সাংবাদিকের প্রশ্নে রহমান হাজারীর জবাব—‘বের করেছি, আপনারা পারলে কিছু করেন’**
বরিশাল নগরীর লাকুটিয়া সড়কসংলগ্ন শশী বাজারে বিএনপির নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার, ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে রহমান হাজারীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি পুরো বাজার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁর প্রভাব ও আচরণে বাজারের ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সেলিম চৌধুরীর সঙ্গে। প্রায় ৩৫ বছর ধরে শশী বাজারে রাস্তার পাশে সরকারি খাসজমিতে দোকান পরিচালনা করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন তিনি। কিন্তু গত দুই-তিন দিন আগে দোকানে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা পরিচালনার সময় রহমান হাজারী তাঁকে দোকান থেকে বের করে দেন এবং দোকানটি তালাবদ্ধ করে রাখেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী সেলিম চৌধুরী।
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়েও আজ নিজের দীর্ঘদিনের জীবিকার জায়গায় প্রবেশ করতে পারছেন না—এমন অভিযোগ স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেলিম চৌধুরী দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর ধরে শশী বাজারে দোকান পরিচালনা করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাঁর বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সেলিম চৌধুরীর দাবি, তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। বাবার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় ব্যবহার করে কারও কাছে কোনো সুবিধাও চাননি।
তাঁর অভিযোগ, দোকানে ব্যবসা চলমান থাকা অবস্থায় রহমান হাজারী বিএনপির ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে তাঁকে বের করে দেন। এরপর দোকানটি তালাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিনের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
প্রশ্ন উঠেছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একজন সাধারণ ব্যবসায়ীর ৩৫ বছরের জীবিকার জায়গা কেড়ে নেওয়ার অধিকার রহমান হাজারীকে কে দিয়েছে?
তালাশ বিডির সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার মাছুদুর রহমান আসলাম ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিনে অনুসন্ধান করেন।
এ সময় স্থানীয়দের বক্তব্যে রহমান হাজারীর বিরুদ্ধে বাজারে প্রভাব বিস্তার, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠে আসে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজারে কখন কার সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হবে, তা নিয়ে তাঁরা উদ্বেগের মধ্যে থাকেন। নিজেদের ব্যবসা পরিচালনা করতেও অনেকে অস্বস্তি ও নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করছেন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি বাজার কি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে চলবে? রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে সাধারণ ব্যবসায়ীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করার অধিকার তাঁকে কে দিয়েছে?
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তালাশ বিডির বরিশাল অফিস থেকে রহমান হাজারীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়।
এ সময় তিনি বলেন, “১৬ বছর আমার কোনো হাটবাজারের দিকে চোখ তুলে তাকাইনি। এখন দল ক্ষমতায় এসেছে, হাটবাজার তো আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।”
তখন তালাশ বিডির পক্ষ থেকে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে বলে কি সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে তাঁর ৩৫ বছরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়া যায়?
জবাবে রহমান হাজারী বলেন, “বের করেছি, আপনারা পারলে কিছু করেন।”
একজন সাংবাদিকের সরাসরি প্রশ্নের জবাবে তাঁর এমন বক্তব্য বাজারের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ওঠা অভিযোগকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকা মানেই কি কোনো ব্যক্তি নিজের ইচ্ছামতো বাজার নিয়ন্ত্রণ করবেন? সাধারণ ব্যবসায়ীদের জীবিকা ও অধিকার নিয়ে এমন আচরণের আইনগত ভিত্তি কী?
দোকান থেকে বের করে তালাবদ্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে সেলিম চৌধুরী বলেন,
“আমি কখনো কোনো রাজনৈতিক দল করিনি। আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা, সেই পরিচয়ও কখনো কাউকে দিইনি। তাহলে আমার সঙ্গে এমন করা হলো কেন? আমার দোকানে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা চলছিল। রহমান হাজারী আমাকে দোকান থেকে বের করে দিয়ে তালাবদ্ধ করে দিয়েছেন। এখন আমি কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করব?”
তিনি আরও বলেন, “আমি এই ঘটনার বিচার আপনাদের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের কাছে দিলাম। আমি একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে ন্যায়বিচার চাই। আমার দীর্ঘদিনের জীবিকার জায়গাটি ফিরে পেতে চাই।”
ঘটনাটি সম্পর্কে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের এয়ারপোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে তালাশ বিডির কথা হয়।
তিনি জানান, ভুক্তভোগীকে লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ওসি বলেন, “আপনারা লিখিত অভিযোগ দিন। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব অবশ্যই।”
শশী বাজারের এই ঘটনা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। ৩৫ বছর ধরে একটি দোকান পরিচালনা করে জীবিকা নির্বাহ করা একজন ব্যবসায়ীকে কোন আইনগত প্রক্রিয়ায় দোকান থেকে বের করে দেওয়া হলো? দোকান তালাবদ্ধ করার অধিকার রহমান হাজারীকে কে দিয়েছে? সরকারি খাসজমি হলে সেটি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কি কোনো ব্যক্তির, নাকি সংশ্লিষ্ট ভূমি প্রশাসনের?
এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। সরকারি খাসজমিতে দোকান পরিচালনার বৈধতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী নির্ধারণ করবে। কিন্তু কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক প্রভাব বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে কাউকে জোর করে উচ্ছেদ কিংবা ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ থাকলে সেটিও তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
শশী বাজারের ব্যবসায়ীরা যেন নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন এবং সেলিম চৌধুরী যেন তাঁর অভিযোগের ন্যায়সংগত প্রতিকার পান, সে জন্য বরিশাল জেলা প্রশাসন, ভূমি প্রশাসন ও পুলিশ কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
রাজনৈতিক পরিচয় কখনো আইনের ঊর্ধ্বে নয়। বিএনপির নাম ব্যবহার করে কেউ যদি সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই প্রত্যাশিত।
এখন দেখার বিষয়, শশী বাজারের ব্যবসায়ীদের আতঙ্ক ও সেলিম চৌধুরীর ৩৫ বছরের জীবিকার প্রশ্নে প্রশাসন কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
তালাশ বিডি—সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন