প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইউরোপের ধনী ফুটবল ক্লাবগুলো একটি বাণিজ্যিক কাঠামো তৈরি করেছে, যা বর্তমানে তাদের মোট আয়ের প্রায় অর্ধেকের উৎস হিসেবে কাজ করছে। এই পরিস্থিতির ফলে ফুটবলের আর্থিক অভিজাত শ্রেণি আরও শক্তিশালী হয়েছে। আয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও, এই অভিজাত গোষ্ঠীতে নতুন সদস্যদের প্রবেশ আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে, এমনটি একটি গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে।
ফুটবল বেঞ্চমার্ক এবং ওয়ার্ল্ড ফুটবল সামিট-এর প্রতিবেদনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, সর্বোচ্চ আয়কারী ক্লাবগুলোর প্রধান আয়ের উৎস হিসেবে সম্প্রচার (ব্রডকাস্টিং) আয়কে ছাড়িয়ে গেছে বাণিজ্যিক আয়। দ্বিতীয়ত, ইউরোপীয় ফুটবলের সামগ্রিক আর্থিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও ধনী এবং অপেক্ষাকৃত কম ধনী ক্লাবগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
বাণিজ্যিক আয়ের আধিপত্য
২০২৪/২৫ মৌসুমে সর্বোচ্চ আয়কারী ১০ ক্লাবের মোট পরিচালন আয়ের ৪৯ শতাংশ এসেছে বাণিজ্যিক ও অন্যান্য উৎস থেকে, যেখানে ২০০৮/০৯ মৌসুমে এই হার ছিল ৩২ শতাংশ। একই সময়ে সম্প্রচার আয়ের অংশ ৪২ শতাংশ থেকে কমে ৩২ শতাংশে নেমেছে এবং ম্যাচডে ও স্টেডিয়াম আয়ের অংশ ২৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নেমেছে।
তবে, আয়ের এই অংশীদারিত্বের হ্রাস মানে মোট অর্থের পরিমাণের হ্রাস নয়। বরং, শীর্ষ ১০ ক্লাবের সম্মিলিত পরিচালন আয় ১৬ বছরে তিন গুণেরও বেশি বেড়ে ২.৭ বিলিয়ন ইউরো থেকে ৮.৪ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে।
এই পরিবর্তন দুটি ধাপে ঘটেছে
২০১০-এর দশকের শুরুতে বাণিজ্যিক আয় সম্প্রচার আয়কে ছাড়িয়ে যায়। ২০১৮/১৯ মৌসুম পর্যন্ত বাণিজ্যিক আয়ের অংশ বৃদ্ধির মূল উৎস ছিল ম্যাচডে আয়ের অংশের হ্রাস। ওই সময় ম্যাচডে আয়ের অংশ ১৬ শতাংশে নেমে আসে, আর সম্প্রচার আয়ের অংশ তুলনামূলকভাবে সামান্য কমে ৪০ শতাংশে দাঁড়ায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ফুটবলের ডিজিটালাইজেশন ও আন্তর্জাতিক বিস্তারের ফলেই এই পরিবর্তন ঘটেছে।
মহামারির পর পরিস্থিতি আবার বদলায়। ২০২১/২২ মৌসুমে ৩৮ শতাংশ থাকা সম্প্রচার আয়ের অংশ ২০২৪/২৫ সালে ৩২ শতাংশে নেমে আসে, আর ম্যাচডে আয় পুনরুদ্ধার হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাণিজ্যিক আয়ের মধ্যে অন্যান্য আয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তাই এটিকে শুধু স্পনসরশিপ আয় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
আয় বৃদ্ধি হলেও কমেনি বৈষম্য
গবেষণাটি উয়েফার আর্থিক প্রতিবেদন, ডেলয়েট ফুটবল মানি লিগ এবং ফুটবল বেঞ্চমার্কের নিজস্ব তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।
ইউরোপের প্রায় ৭০০টি শীর্ষ বিভাগের ক্লাবের মোট পরিচালন আয় ২০০৮/০৯ মৌসুমে ১১.৬ বিলিয়ন ইউরো থেকে বেড়ে ২০২৩/২৪ মৌসুমে ২৮.৬ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। প্রতিবেদনের হিসাবে, ২০২৪/২৫ মৌসুমে এই অঙ্ক প্রথমবারের মতো ৩০ বিলিয়ন ইউরো অতিক্রম করেছে।
আগে যেসব আয় কেবল ব্যতিক্রমী ক্লাবগুলোর ছিল, এখন আরও বেশি ক্লাব সেই পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৪/২৫ মৌসুমে ৩৩টি ক্লাব ২০০ মিলিয়ন ইউরোর বেশি আয় করেছে, যেখানে ২০০৮/০৯ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র আট। একই সময়ে ৩০০ মিলিয়ন ইউরোর বেশি আয় করা ক্লাবের সংখ্যা বেড়ে তিন থেকে ১৭ হয়েছে।
আর্থিক শক্তির কেন্দ্র আরও বেশি করে ইংল্যান্ডের দিকে ঝুঁকেছে। ২০২৩/২৪ মৌসুমে ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোর মোট আয়ের ২৬ শতাংশ এসেছে প্রিমিয়ার লিগ ক্লাবগুলোর কাছ থেকে, যেখানে ২০০৮/০৯ সালে এই হার ছিল ২১ শতাংশ।
২০২৪/২৫ মৌসুমে সর্বোচ্চ আয়কারী শীর্ষ ১০ ক্লাবের মধ্যে ছয়টি ছিল ইংল্যান্ডের, যেখানে ১৬ বছর আগে ছিল চারটি। বিপরীতে ইতালির প্রতিনিধিত্ব তিন থেকে শূন্যে নেমে এসেছে।
ধনীরা আরও ধনী
ফুটবল বেঞ্চমার্কের পরামর্শ বিভাগের পরিচালক আন্তোনিও দি চিয়ানি বলেন, “এই প্রবৃদ্ধি সমানভাবে ঘটছে না। ধনী ক্লাবগুলো অন্যদের তুলনায় অনেক দ্রুত গতিতে আরও ধনী হয়ে উঠছে।”
তিনি আরও বলেন, “বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সমর্থক গোষ্ঠীর কারণে এই ক্লাবগুলো এখন বিশাল মিডিয়া শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তাদেরকে আর শুধু ফুটবল ক্লাব বলা যায় না।”
চিয়ানি মনে করেন, নতুন ফরম্যাটের চ্যাম্পিয়ন্স লিগও এই বৈষম্য বাড়িয়েছে। কারণ টুর্নামেন্টের আয় বেড়েছে এবং সাধারণত বড় ঘরোয়া ক্লাবগুলোরই এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ বেশি থাকে।
তার ভাষায়, “দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে এটি একটি ইতিবাচক বা নেতিবাচক চক্র। ক্লাবগুলোর আয় যত বাড়ে, তারা তত ভালো দল গড়তে পারে। ভালো দল মানে মাঠে ভালো ফলাফল, আর সেটি আবার আয় বাড়াতে সাহায্য করে।”
টেলিভিশনের গুরুত্ব এখনো আছে
যদিও বাণিজ্যিক ও অন্যান্য আয়ের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে দ্রুত হয়েছে, ছোট ও মাঝারি ক্লাবগুলোর জন্য সম্প্রচার আয়ের গুরুত্ব এখনো অনেক বেশি।
২০১৪/১৫ থেকে ২০২৩/২৪ সময়ে ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে বাণিজ্যিক ও অন্যান্য আয় গড়ে বছরে ৭ শতাংশ হারে বেড়ে ১২.৬ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। মহামারির সময় বহু বছরের চুক্তির কারণে এই আয় সবচেয়ে স্থিতিশীল ছিল।
একই সময়ে ঘরোয়া সম্প্রচার আয় ৫.৮ বিলিয়ন ইউরো থেকে বেড়ে ৮.৫ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। আর উয়েফার বিতরণকৃত অর্থ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৩.২ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে।
ম্যাচডে আয়ও মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে ২০২০/২১ মৌসুমের ৫০০ মিলিয়ন ইউরো থেকে ২০২৩/২৪ মৌসুমে ৪.৪ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে, যা মহামারির আগের রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে।
মূল্য বেড়েছে, বদলায়নি শীর্ষস্থান
ফুটবল বেঞ্চমার্কের হিসেবে, ২০২৬ সালে ইউরোপের সবচেয়ে মূল্যবান ৩২টি ক্লাবের সম্মিলিত এন্টারপ্রাইজ ভ্যালু দাঁড়িয়েছে ৭২.৬ বিলিয়ন ইউরো, যা ২০১৬ সালের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।
তবুও শীর্ষ পর্যায়ে নতুন ক্লাবের উত্থান খুবই সীমিত। গত এক দশকে সবচেয়ে মূল্যবান ১০ ক্লাবের তালিকায় মাত্র ১১টি ভিন্ন ক্লাব জায়গা করে নিতে পেরেছে। অর্থাৎ, ইউরোপীয় ফুটবলের আর্থিক পরিসর যতই বড় হোক না কেন, এর ক্ষমতাকেন্দ্র খুব কমই বদলেছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন