প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সাতক্ষীরা, ২৩ আগস্ট, ২০২৬ : যখন বাজারে ভেজাল তেলের ছড়াছড়ি, তখন সাতক্ষীরার বিসিক শিল্প নগরীতে খাঁটি সরিষার তেল উৎপাদন করে সাড়া ফেলেছেন সফল উদ্যোক্তা মোশাররফ হোসেন। কিছুকাল আগে মধুর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি, কিন্তু বর্তমানে ১২টি তেঁতুল কাঠের ঘানি এবং আধুনিক ফিল্টার মেশিনের মাধ্যমে মাসে প্রায় ২০ টন সরিষার তেল উৎপাদন করছেন। এই উৎপাদন স্থানীয় পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বেকারত্ব দূরীকরণ এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থানে সাহায্য করছে। স্থানীয় সরিষা থেকেই উৎপাদিত এ তেল এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলে যাচ্ছে।
উদ্যোক্তা মোশারফ হোসেন (৪৫) সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পার্শ্বেমারী গ্রামের মো. মজিদ গাজী ও করিমন নেছা দম্পতির সন্তান।
জানা যায়, সাতক্ষীরায় কাঠের ঘানির মাধ্যমে খাঁটি সরিষার তেল উৎপাদন একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। তেঁতুল বা অন্যান্য কাঠের ঘানিতে ভাঙানো তেলের জন্য এলাকায় রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। ভোজ্য তেলের বাজারে বিশুদ্ধতার নিশ্চয়তা প্রদান করে সাতক্ষীরার বিসিক শিল্প এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আধুনিক तেল মিল ‘সুন্দরবন ওয়েল’। উদ্যোক্তা মোশারফ হোসেনের নেতৃত্বে এখানে চলছে তেঁতুল কাঠের ঘানিতে সরিষা মাড়াইয়ের কাজ। প্রতিদিন ৫ টন সরিষা মাড়াইয়ের মাধ্যমে মাসে ২০ টনেরও বেশি তেল উৎপাদিত হচ্ছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪২ লাখ টাকা। উৎপাদিত তেলের পাশাপাশি খৈলও স্থানীয় মৎস্য ঘেরগুলোতে ব্যবহৃত হচ্ছে। জেলায় তার মতো আরো অনেক উদ্যোক্তা কাঠের ঘানিতে সরিষা মাড়াই করেও তেল উৎপাদন শুরু করেছেন। যা স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বিভিন্ন বাজারে পাঠানো হচ্ছে।
মিলের ম্যানেজার হাবিবুল্লাহ বাসসকে জানান, তাদের প্রথম কার্যক্রম চাষীদের কাছ থেকে সরিষা সংগ্রহ করার মাধ্যমে শুরু হয়। এরপর আন্তরিকভাবে এ সরিষা শুকিয়ে কাঠের ঘানিতে দেয়া হয়। ঘানি থেকে ৮০-৮৫ পার্সেন্ট তেল বের হলে তা দ্বিতীয় পর্যায়ে স্লাপার মেশিনে যায় এবং সেখানে আরো ১০-১৫ পার্সেন্ট তেল বের হয়। পরবর্তী ধাপে তেলগুলো অত্যাধুনিক ফিল্টার মেশিনের মাধ্যমে পরিশোধিত হয়ে বোতলজাত করে খুচরা ও পাইকারি বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, প্রতিদিন মিল থেকে ২০-২৫ মণ সরিষা মাড়াই করা হচ্ছে, আর এর থেকে ১ হাজার থেকে ১২’শ মণ তেল উৎপাদিত হচ্ছে। এছাড়া, প্রতিদিন ২০-২৫ বস্তা খৈল উৎপাদিত হয়। এই খৈল স্থানীয় মৎস্য ও গরুর খামারে বিক্রি করা হয়।
তিনি আরও জানান, মিলের বিশেষত্ব হলো এখানে শতভাগ দেশি সরিষা ব্যবহার করা হয়। কোল্ড প্রেস এবং আধুনিক ফিল্টার প্রযুক্তির ব্যবহারসহ উৎপাদিত এ তেলের মান স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে অনেক ভালো লেগেছে।
কর্মচারী আশিকুজ্জামান জানান, এ মিলে আমরা ১০ জন শ্রমিক কাজ করছি। এখানে আমাদের যে বেতন দেয়া হয়, তা দিয়ে আমরা আমাদের পরিবার নিয়ে ভালোভাবে আছি। দুই শিফ্টে ৬ ঘন্টা করে আমরা সবাই মিলে এখানে কাজ করি।
কারখানা দেখতে আসা মো. তরিকুল ইসলাম জানান, মোশারফ ভাইয়ের ‘সুন্দরবন অয়েল’ মিলটি দেখে তার খুব ভালো লেগেছে। তিনি তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করতে চান।
‘সুন্দরবন অয়েল’ মিলের স্বত্বাধিকারী মো. মোশারফ হোসেন বাসসকে বলেন, বিসিক শিল্প নগরীতে আমার একটি মধু প্রসেসিং সেন্টার রয়েছে। তার সাথে সাতক্ষীরায় ব্যাপক প্রেক্ষাপটে সরিষার চাষের কারণে আমি ভেজাল মুক্ত সরিষার তেল সরবরাহের উদ্দেশ্যে ‘সুন্দরবন অয়েল’ মিল প্রতিষ্ঠা করেছি। প্রতিদিন এখানে ৫ টন সরিষা মাড়াই হচ্ছে। যা থেকে ২ থেকে ৩ টন তেল উৎপাদিত হচ্ছে। এই তেল বর্তমানে সারা দেশে পাইকারি দামে বাজারজাত করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, তার এ মিলের মাধ্যমে বর্তমানে ১০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। আরও অনেক ছোট উদ্যোক্তা তার কাছ থেকে তেল নিয়ে অনলাইনে খুচরা তেলের ব্যবসা করছেন। এসময় তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিনা বাধায় বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানান যাতে বিসিক শিল্প নগরীর সকল কলকারখানা চালু থাকে।
সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এ শিল্পটি জাতীয় পর্যায়ে বৃহত্তর অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
সাতক্ষীরার বিনেরপোতা বিসিক শিল্প নগরীর উপ-ব্যবস্থাপক গৌরব দাস বাসসকে জানিয়েছেন, শিল্প নগরী সাতক্ষীরা ১৫ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নানা শিল্প-কারখানার মাধ্যমে। এদের মধ্যে অনেক উদ্যোক্তা খুবই উদ্যমী, যার মধ্যে ‘সুন্দরবন অয়েল’ মিলের স্বত্তাধিকারী মোশারফ অন্যতম। তিনি তার মধু প্রসেসিং কারখানা থেকে এবারের তেঁতুল কাঠের ঘানি দিয়ে সরিষার তেল উৎপাদন করছেন, যা অল্প সময়েই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। চাহিদার কারণে বর্তমান সময়ে তিনি যথেষ্ট তেল সরবরাহ করতে পারছেন না। বিসিক তাকে প্রশিক্ষণ ও ঋণের ব্যবস্থা করেছে বিধায় ভবিষ্যতে তার মতো উদ্যোক্তাদের সহায়তা অব্যাহত থাকবে। তার মতে, এসব উদ্যোক্তার মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন