প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
এশিয়ার 'ওয়াটার টাওয়ার' হিসেবে পরিচিত হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চল বর্তমানে উষ্ণায়নের করাল গ্রাসে অভূতপূর্ব পরিবেশগত সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। শতাব্দী ধরে যে পর্বতমালা কোটি কোটি মানুষের তৃষ্ণা মেটাতে সাহায্য করেছে, তা এখন নিজেই গলে বিলীন হতে চলেছে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এই অঞ্চলে হিমবাহের গলে যাওয়ার গতি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বরফ ক্ষয়ের হার শতাব্দীর সূচনালগ্ন থেকে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এটি সামগ্রিক পরিবেশ ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে। কাঠমাণ্ডুভিত্তিক আন্তঃসরকারি সংস্থা 'ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট' (আইসিআইএমওডি)-র প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে এই অঞ্চলে বরফের পরিমাণ বহুগুণ কমে গেছে। বিশেষত ১৯৭৫ সালের পর থেকে হিমালয়ের বিভিন্ন অংশে প্রায় ২৭ মিটার পর্যন্ত হিমবাহের পুরুত্ব ক্ষয় হয়েছে।
এই চরম বাস্তবতার কারণে হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসীরা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। সম্প্রতি নেপালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় আড়াই শতাধিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা এই নির্মম সত্যকে আবার সামনে এনেছে। গবেষক ও বিজ্ঞানীরা এই বিপর্যয়ের পেছনের বিভিন্ন কারণ বিশ্লেষণ করে একটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক প্রবণতা চিহ্নিত করেছেন। উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে যেখানে পূর্বে কেবল তুষারপাত হতো, সেখানে এখন স্বাভাবিক তুষারপাতের পরিবর্তে অঝোর ধারায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চার হাজার মিটার বা তারও বেশি উচ্চতায় এই অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত পার্বত্য ঢালকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং দ্রুত বরফ গলিয়ে আকস্মিক ঢলের সৃষ্টি করছে।
অতিরিক্ত উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহের পেছনের স্থায়ী বরফ বা পারমাফ্রস্টের অবক্ষয় ঘটছে, যা পাহাড়ের পাথর ও বরফের মিশ্রণ ধসে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নেপালের সাম্প্রতিক বন্যায় কোনো উচ্চ-উচ্চতার স্থান থেকে বরফ ও পাথরের বিরাট ধস নেমে এসেছিল। বিশাল পরিমাণের সেই ধ্বংসাবশেষ কোনো নদীতে পতিত হয়ে পানির গতিপথ রুদ্ধ করে এবং পরবর্তীতে তা ভেঙে গিয়ে বিপুল জলরাশি, পলি ও পাথর নিচের দিকে ধেয়ে আসে। হিমবাহ পিছু হটার ফলে পূর্বে বরফে ঢাকা এলাকাগুলো এখন উন্মুক্ত ও শুষ্ক পাথুরে জমিতে পরিণত হয়েছে।
এই অনাবৃত শিলাখণ্ডগুলো সূর্যালোক থেকে অধিক পরিমাণে তাপ শোষণ করে আশপাশের পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে, যা পুরো প্রক্রিয়াটিকে একটি ভয়াবহ চক্রের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই উচ্চতা-ভিত্তিক উষ্ণায়নের কারণে পর্বতগুলোর ওপরের স্তরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলকে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর বাইরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বরফের আধার বলা হয়ে থাকে। প্রায় সাড়ে পঞ্চান্ন হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা তেষট্টি হাজারেরও বেশি হিমবাহ এশিয়ার প্রধান দশটি নদী ব্যবস্থার উৎস। এই নদীগুলোর ওপর সরাসরি নির্ভর করে অববাহিকায় বসবাসকারী প্রায় দুইশত কোটি মানুষের খাদ্য, পানি ও জীবনজীবিকা। কিন্তু আইসিআইএমওডি-র উপাত্ত অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের হিমবাহগুলো তাদের মোট আয়তনের প্রায় বারো শতাংশ এবং আনুমানিক বরফ সঞ্চয়ের নয় শতাংশ হারিয়েছে। বিশেষ করে সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বরফ ক্ষয়ের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি, যা পুরো এশিয়ার পানি নিরাপত্তার জন্য এক বিরাট শঙ্কার বিষয়। যদি এখনই বৈশ্বিক পর্যায়ে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে এই হিমবাহগুলোর ক্ষয় এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে যেখানে তা আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।
সূত্র: এনডিটিভি
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন