প্রিন্ট এর তারিখঃ ২৮শে অক্টোবর, ২০২৬ইং; ০৮:২১ এম || প্রকাশের তারিখঃ ২ই জুলাই, ২০২৬ইং; ০১:৩৮ এম
৩য় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা ছাড়া ইরান মার্কিন ইজরায়েল যুদ্ধ বন্ধ হবে না!
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সংঘাতের অস্বস্তিকর বাস্তবতা হলো, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানে হামলার মাধ্যমেই মূলত সম্ভাব্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়েছে।
যুদ্ধে পশ্চিমা শক্তির পরিকল্পনা মতে দ্রুত বিজয় অর্জন ও সাফল্যের প্রত্যাশা - ইরানের অনাকাঙ্ক্ষিত শক্তিশালী প্রতিরোধের মুখে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। এ কারণে পশ্চিমা শক্তি তথা বর্তমান সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার জেদি ও একগুয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মান বাঁচাতে সাময়িক যুদ্ধবিরতির কথা বললেও এই যুদ্ধ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ না বাঁধিয়ে তিনি ঘরে ফিরবেন না বা এমনটাও বলা যেতে পারে যে, বিশ্ব আধিপত্যের ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখতে গিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রশক্তি ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ পশ্চিমা শক্তি চালিয়ে যাবে যতক্ষণ না তারা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে তার অবস্থান থেকে ধ্বংস করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ধোঁয়া হয়তো কিছুটা পাতলা হয়েছে, কিন্তু সংকটের মেঘ একটুও সরেনি। যুদ্ধবিরতি, মধ্যস্থতা কিংবা কূটনৈতিক সংলাপকে অনেকেই শান্তির পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন। কিন্তু ইতিহাস বলে, বহু বড় যুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক অধ্যায় শুরু হয়েছে ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন বিশ্ব ভেবেছিল সংঘাত শেষের পথে। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বের সর্বস্বক্তি দিয়ে যখন ইরানকে পর্যদুস্থ করার সম্ভব হয়নি তখন আলোচনা টেবিলে সময় ক্ষেপণের নামে একটি মারাত্মক ও ধ্বংসলীলা চালানোর পরিকল্পনা যে পশ্চিম বিশ্বের আছে এমন কথা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
বিগত ৪০ দিনের যুদ্ধে বিশ্বের সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্মিলিত সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে ইরান যে প্রতিরোধ শক্তি বা সামরিক সক্ষমতা ইতিমধ্যে দেখিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো যেভাবে গুঁড়িয়ে দিয়েছে তা যদি আরও ব্যাপক আকারে বিস্তৃত না করতে পারে কিংবা পরমাণু অস্ত্র না তৈরি করতে পারে, তাহলে অত্যাসন্ন সম্ভাব্য মার্কিন ইসরাইলের ধ্বংসলীলা চালানোর সেই আক্রমণ ইরান প্রতিরোধ করতে পারবে কিনা সেটা সন্দেহের উদ্রেক করে। সুতরাং ইরান ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি হিসেবে কতটি পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে কিংবা তার ভূগর্ভস্থ বাংকারে কত হাজার ব্যালাস্টিক হাইপারসনিক মিসাইল কিংবা কত হাজার বা লক্ষ অ্যাটাক ড্রোন সংরক্ষণ করতে পারবে কিংবা কত সংখ্যক আইসিবিএম বা আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করলে তার সমূহ আক্রমণ পূর্বের মতো ঠেকাতে পারবে তা ইরান নির্ধারণ করতে পারবে কিনা তা সময়েই বলে দিবে। তবে ইরানকে এটা মনে রাখতে হবে যতক্ষণ সে পূর্ণ শক্তি দিয়ে পশ্চিমা শক্তির প্রতিরোধ সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে ততক্ষণ পশ্চিমা শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তিগুলো নিজেদের সার্বভৌমত্ব অর্থনীতি ও জ্বালানির স্বার্থেই চীন, রাশিয়া কিংবা উত্তর কোরিয়া বা তাদের পক্ষ শক্তি ইরানকে পূর্ণ সমর্থন করবে- পূর্বের ইতিহাস থেকে এমন ধারণা করা যায়।
আজকের ইরান–যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সংঘাতকে বিচ্ছিন্ন কোনো সামরিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই ক্ষীণ হচ্ছে। এটি কেবল ক্ষেপণাস্ত্রের লড়াই নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত প্রভাব, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এবং পরিবর্তিত বিশ্বশক্তির ভারসাম্যকে ঘিরে এক গভীর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।
এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। বর্তমান যুদ্ধ কি সত্যিই সমাপ্তির দিকে এগোচ্ছে, নাকি এটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সংঘাতের একটি মধ্যবর্তী অধ্যায় মাত্র? এর নিশ্চিত উত্তর আজ কারও কাছে নেই। তবে এটি একটি আলোচনাযোগ্য ভূরাজনৈতিক মতামত যে, যদি প্রধান শক্তিগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস, প্রক্সি সংঘাত এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতা একই গতিতে চলতে থাকে, তাহলে এই সংকট আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি অস্বীকার করা কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্র বহু দশক ধরে বৈশ্বিক প্রভাব ধরে রাখার কৌশল অনুসরণ করেছে। অন্যদিকে চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা, রাশিয়ার পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূকৌশলগত গুরুত্ব—সব মিলিয়ে এই সংঘাত এখন বহু শক্তির স্বার্থের সংযোগস্থলে অবস্থান করছে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতিটি নতুন উত্তেজনা শুধু একটি দেশের নয়, পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্যও পরীক্ষা হয়ে উঠছে।
সেই কারণেই যুদ্ধবিরতির ঘোষণাকে চূড়ান্ত শান্তির নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার আগে বাস্তবতাকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। কারণ ইতিহাসের কঠিন শিক্ষা হলো—যখন কূটনীতি দুর্বল হয়, অবিশ্বাস বাড়ে এবং শক্তির রাজনীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠে, তখন আঞ্চলিক সংঘাত আন্তর্জাতিক সংকটে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
অতএব, এই সংঘাতকে শেষ হয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়ার চেয়ে এটিকে একটি চলমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখা অধিক বাস্তবসম্মত। ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, তা নির্ধারণ করবে যুদ্ধক্ষেত্রের গোলাবারুদ নয়; বরং বৃহৎ শক্তিগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কৌশলগত সংযম এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির কার্যকারিতা। আর যদি সেই সংযম ব্যর্থ হয়, তবে বিশ্বের সামনে আরও বিস্তৃত ও জটিল সংঘাতের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
ইরানে ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলার মাধ্যমে বিশ্ব ধ্বংসের যে অগ্নি স্ফুলিঙ্গ মধ্যপ্রাচ্য তথা ইরানে জ্বলে উঠেছে, সেই আগুন পরমাণু বোমায় বিস্ফোরিত হয়ে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে শুরু করে পূর্ব এশিয়ার চীন, বৃহৎ পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া সহ আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর দ্বিধাবিভক্তির মাধ্যমে তথা পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির মাধ্যমে একটি সম্ভাব্য ও মহা ধ্বংস লীলা চালানোর মতো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু না হওয়া পর্যন্ত ইরান ইসরাইল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ থামছেনা তা বরং চলতেই থাকবে- এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন
কপিরাইট © ২০২৪-২৫ তালাশ বিডি.কম সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। || Design & Developed By "Talash BD Media Limited"