প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাংক সুদের হার তিন বছরেরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো বাড়ানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক 'ফেডারেল রিজার্ভ' জানিয়েছে, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির লাগাম টানার উদ্দেশ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে সুদের হার আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা প্রকাশ করেছেন। খবর বিবিসি বাংলার।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যাংক সুদের হার কমানোর জন্য আহ্বান জানালেও, ফেডারেল রিজার্ভের নীতি নির্ধারকরা সর্বসম্মতিক্রমে সুদের হার ৩ দশমিক ৫-৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৭৫-৪ শতাংশ নির্ধারণ করেছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ বলেছেন, "মূল্যস্ফীতি এখন অনেক বেশি এবং লম্বা সময় ধরেই সেটি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।" তিনি জানান, মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তার মতে, এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত "বিচক্ষণ" এবং "দায়িত্বশীল"।
ওয়ার্শের সুদের হার বৃদ্ধির ঘোষণার পর, ট্রাম্প সমর্থন জানিয়েছেন। তবে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ডের সিদ্ধান্তকে "ক্ষ্যাপাটে" বলে মন্তব্য করেছেন।
সুদের হার বৃদ্ধির ফলে যারা ব্যাংক ঋণ, বন্ধকি ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ড নিতে চান, তাদের খরচ কিছুটা বাড়বে। অন্যদিকে, ঋণের বদলে যারা সঞ্চয়ের দিকে ঝুঁকবেন, তারা লাভবান হবেন।
গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে ওয়ার্শ বলেন, "তাদের নেতৃত্বের মধ্যে 'আশাবাদী মনোভাব' থাকলেও এটাই বাস্তবতা যে, মূল্যস্ফীতি এখনও একটি সমস্যা হয়ে রয়ে গেছে।"
অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো, ফেডারেল রিজার্ভও মুদ্রাস্ফীতির হার দুই শতাংশ বা তার নিচে রাখার লক্ষ্যে কাজ করছে। তিনি উল্লেখ করেন, "পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে" সেটি লক্ষ্যমাত্রার ওপরেই রয়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি মার্কিন ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগের একটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাইকারি বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়েছে। এই কারণে অনেক পণ্য ও পরিষেবার দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে।
ওয়ার্শ বলেন, "কোনো একক পণ্যের মূল্যের ওপর তারা কোনো প্রভাব রাখতে পারেন না।" তিনি জানান, দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি যেন আর না বাড়ে, সে লক্ষ্যে তারা কাজ করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, "কর্মসংস্থানসহ বৃহত্তর অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে পণ্যমূল্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার দিকে মনোনিবেশ করছে ফেডারেল রিজার্ভ।" মূল্যস্ফীতি কমে আসলে কম সচ্ছল ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।
একটি দেশের অর্থনীতিতে যখন মূল্যস্ফীতি বেশি থাকে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত ব্যয় নিরুৎসাহিত করা এবং সঞ্চয়ে উৎসাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে সুদের হার বাড়িয়ে দেয়। এভাবে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে বলে তারা আশা করেন।
তবে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সুদের হার বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের উপকৃত হলেও ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে উৎসাহ কম দেখায়। এতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
যে বার্তা দিচ্ছে
যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে যখন ওয়ার্শের নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়, তখন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা অভিযোগ করেছিলেন যে, তিনি ট্রাম্পের "হাতের পুতুল" হবেন।
ফেড পর্যবেক্ষকদের মধ্যে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যে, সুদের হার ব্যাপকভাবে কমানোর জন্য তিনি ট্রাম্পের দাবিগুলো পূরণ করবেন। কারণ ওয়ার্শের আগে যিনি ওই দায়িত্বে ছিলেন, সেই জেরোম পাওয়েল ব্যাংক সুদের হার না কমানোয় ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।
বুধবার সুদের হার বৃদ্ধির ঘোষণার মাধ্যমে ট্রাম্পকে কি কোনো বার্তা দেওয়া হচ্ছে? ওয়ার্শ বলেন, "প্রেসিডেন্টের বিষয়ে আপনাকে বলার মতো আমার কাছে কিছু নেই।"
এদিকে, সুদহার বৃদ্ধির ঘোষণার পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, "কেভিনের (ওয়ার্শ) ওপর ভরসা করছি, কিন্তু তিনি খুবই কঠিন একটি বোর্ডের সামনে পড়েছেন।"
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, "আর সুদের হার অনেক বেশি, এগুলো সঙ্গত নয়। আমি কেভিনের সঙ্গে কথা বলেছি। তাকে বলেছি, তুমি বরং বোর্ডের পক্ষেই ভোট দাও, কারণ তাতে কিছু যায় আসে না। বোর্ডটি খুবই ক্ষ্যাপাটে, অত্যন্ত রাজনৈতিকও বটে।"
এর আগে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টে ট্রাম্প বলেছিলেন, "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুদের হার কমান, এবং সেটা দ্রুত!"
কেমন প্রভাব পড়বে?
ক্যাপিটল হিলের ডেমোক্র্যাটরা বলেছেন, সুদের হার বৃদ্ধির ফলে ঋণ নেওয়া এখন আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে এবং এর ফলে আরও বেশি সংখ্যক আমেরিকান ঋণগ্রস্ত হবে। সিনেটের শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার বলেন, "এর ফলে সবকিছুর দাম আরও বেড়ে যাবে। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প জানেন না কীভাবে অর্থনীতি চালাতে হয়।" সুদের হার বাড়ানোর কারণে এখন ঋণের খরচ বাড়বে। বিশেষ করে, যারা ঋণ করে বাড়ি কিনতে চাচ্ছেন, তাদের ব্যয় বাড়বে। সেইসঙ্গে, ক্রেডিট কার্ড ও ব্যক্তিগত ঋণের খরচও বেড়ে যাবে।
সুদহার বৃদ্ধির ঘোষণার পর গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ব্যাংকগুলোর মধ্যে জেপি মরগ্যান, কিকর্প এবং বিএনওয়াই তাদের 'প্রাইম লেন্ডিং রেট' ৬.৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করেছে। গত এক বছরে মর্টগেজের খরচ বাড়লেও তা ২০২৩ সালের সর্বোচ্চ স্তরের নিচে রয়েছে।
ফ্রেডি ম্যাকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩০ বছর মেয়াদী ঋণের গড় সুদের হার এখন ৬.৭৬ শতাংশ। আর ১৫ বছর মেয়াদী ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার ৬.০৯ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বাড়ির মালিকের ৩০ বছর এবং ১৫ বছর মেয়াদী মর্টগেজ রয়েছে। 'ফিক্সড ডিল' হওয়ায় সুদের হারের পরিবর্তন তাদের মাসিক কিস্তির ওপর সেভাবে প্রভাব ফেলবে না।
কিন্তু উচ্চ সুদের হার তাদের প্রভাবিত করতে পারে, যারা নতুন করে মর্টগেজ নিতে চান।
ফেডের সুদের হার কোন দিকে যাবে, সে বিষয়ে নিজের মতামত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা ওয়ার্শ। তবে তার বেশিরভাগ সহকর্মী নীতি নির্ধারক বলেছেন যে, তারা বিশ্বাস করেন এই বছরের শেষ নাগাদ সুদের হার আবারও বাড়তে পারে এবং সেটি বেড়ে ৪ থেকে ৪.২৫ শতাংশ হতে পারে।
নীতি নির্ধারকদের মধ্যে কেউ কেউ এমন কথাও বলেছেন যে, ২০২৮ এবং ২০২৯ সালে সুদের হার কমতে শুরু করতে পারে। তবে তার আগে আগামী বছর সুদের হার আরও বেড়ে ৪.২৫ থেকে ৪.৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, আগামী বছরগুলোতে মূল্যবৃদ্ধি হ্রাস পাবে এবং সেটি ২০২৯ সালের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে কমে ফেডের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাবে।
উল্লেখ্য যে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভই কেবল ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপে পড়েছে- বিষয়টি এমন নয়। ইউরোপসহ অন্যান্য দেশগুলোও একই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে।
এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত সপ্তাহে ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়েছে। এছাড়া ব্যাংক অব ইংল্যান্ডও বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত জানাতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন