প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি ১২ কেজি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলপিজি) দাম ৭.৫৭ শতাংশ বৃদ্ধি করে ১৯৭৬ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিইআরসি আয়োজিত দিনব্যাপী গণশুনানিতে এই সুপারিশটি উপস্থাপন করা হয়, যেখানে এলপিজির দাম পুনর্নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা হয়।
এদিকে, সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীরা এলপিজির দাম ২১.৫ শতাংশ বৃদ্ধি করে ২,২৩২ টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। কমিশন আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে। চলতি অক্টোবরের শুরুতে বিইআরসি এলপিজির দাম ১,৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছিল, তবে বাজারে প্রতিটি সিলিন্ডার ২,১০০-২,৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমদের সভাপতিত্বে রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে কমিশনের সদস্য (অর্থ, প্রশাসন ও আইন) আব্দুর রাজ্জাক, সদস্য (গ্যাস) মিজানুর রহমান, সদস্য (বিদ্যুৎ) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
শুনানিতে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব), বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, সাসটেইনেবল এনার্জি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন্স (সেরা), এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি, সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেড এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশসহ (ক্যাব) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য তুলে ধরেন।
জালাল আহমদ বলেন, "সাধারণ মানুষ যেন যৌক্তিক মূল্যে এলপিজি পায় এবং ব্যবসায়ীরা যাতে লোকসানের শিকার না হন, আমরা দুদিকে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করব।" তিনি আরও জানান, মাসের প্রথম সপ্তাহে মূল্য ঘোষণা করা হবে এবং চেষ্টা করা হচ্ছে ১-২ তারিখের মধ্যে মূল্য ঘোষণা করা যায়। তিনি বলেন, "যেসব আমদানিকারক ব্যাংকিং সমস্যার কারণে এলসি খুলতে পারছেন না, তারা যাতে দ্রুত এলসি খুলতে পারেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলে আমরা সে ব্যবস্থা করব।"
এদিকে, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের কমিশন ১৯১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৭৮ টাকা করার প্রস্তাব বিভিন্ন কোম্পানি দিয়েছে। এর মধ্যে ওমেরা ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেল্টা ৩৬০ টাকা এবং মেঘনা গ্রুপ ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব দেয়।
অন্যদিকে, পরিবেশকরা কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা নির্ধারণের আবেদন করেছেন।
এক পর্যায়ে এলপিজি সরবরাহে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে বিক্রি ও কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া এবং বাজার অস্থিতিশীল করার সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পাঁচ কোম্পানির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার প্রতিবাদে অর্থনীতি সমিতির প্রতিনিধি অধ্যাপক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান শুনানি বয়কট করেন।
ব্যবসায়ীদের মাফিয়া বলায় হট্টগোল
এদিকে, এলপিজি ব্যবসায়ীদের ‘মাফিয়া’ অভিহিত করাকে কেন্দ্র করে বিইআরসির গণশুনানির শেষদিকে হট্টগোল সৃষ্টি হয়েছে। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) সদস্য শাহ আলম সরকার বলেন, "বিইআরসি একটা দাম নির্ধারণ করেই দায়িত্ব শেষ করে দেয়। এলপিজি ব্যবসায়ীরা গ্রাহকের কাছ থেকে তাদের ইচ্ছামতো দাম আদায় করেন। এসব মাফিয়া ডনদের নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নেই।"
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল এই সময় ‘মাফিয়া’ শব্দ নিয়ে আপত্তি জানান। তিনি শাহ আলমকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "আপনি তাদের মাফিয়া বলতে পারেন না।" শাহ আলম বলেন, "পত্রিকাগুলো তাদের অহরহ মাফিয়া বলছে। মানুষের অধিকার নিয়ে তারা ছিনিমিনি খেলছে। ১,৮৩৭ টাকার সিলিন্ডার আড়াই হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে। আপনারা কেবল দাম ঘোষণা করেই বসে আছেন। তাদের মাফিয়া বলব না, তো কী বলব?"
জালাল আবারও জোর দিয়ে বলেন, "পত্রিকাগুলো তাদের মাফিয়া বললেও আপনি বলতে পারেন না, অন্তত এখানে বলবেন না।" বিইআরসি চেয়ারম্যানের বক্তব্যে উপস্থিত সাধারণ শ্রোতাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। কেউ কেউ বলেন, "আপনি এখন বিচারকের আসনে আছেন। কেন ব্যবসায়ীদের পক্ষে ওকালতি করছেন?"
এতে কিছু সময়ের জন্য হলরুমে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এলপিজি ব্যবসায়ীদের একাংশ শাহ আলমকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। আবার তাদের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান ক্যাবসহ অন্য সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা। তবে কমিশন পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।
অর্থনীতি সমিতির ক্ষোভ
আলোচনায় অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইয়ের প্রতিবেদনে পাঁচটি এলপিজি সরবরাহকারী কোম্পানির বিরুদ্ধে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি জানতে চান, এসব অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে কি না এবং অভিযুক্ত কোম্পানির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রির মাধ্যমে ভোক্তাদের কাছ থেকে আদায় করা অতিরিক্ত অর্থের বিষয়ে বিইআরসি কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সেটিও তিনি জানতে চান।
তিনি বলেন, এক মাসে বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে এলপিজি বিক্রি করে ভোক্তাদের কাছ থেকে প্রায় ৬৩০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছে। এ অবস্থায় খুচরা বিক্রেতাদের জরিমানা করেই কি অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়টি বৈধ হয়ে গেছে, সেই প্রশ্নও তুলেছে সংগঠনটি। বিইআরসির জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কমিশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন নিষ্পত্তি না করা, কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে পাঁচটি কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে এলপিজি বিক্রির ঘটনায় আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার প্রতিবাদে শুনানি বয়কটের ঘোষণা দেন তিনি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন