প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
একটি সংসার ছিল। দুই কন্যাসন্তান ছিল। কিন্তু সেই সংসারের ভেতরেই দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের অভিযোগ ছিল। স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ঝর্ণা আক্তার দুই সন্তানকে নিয়ে মায়ের আশ্রয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। তবে সেখানে গিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। মায়ের বাড়িতে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তাঁকে। প্রায় এক দশক পর সেই হত্যার মামলায় আদালতের রায়ে স্বামী ইসমাইল সাগর মিয়ার মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জনাকীর্ণ আদালতে আসামির অনুপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ১ম আদালতের বিচারক সুপ্রিয়া রহমান। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আসামিকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।
দণ্ডপ্রাপ্ত ইসমাইল সাগর মিয়া (৩২) কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার উত্তর সরারচর এলাকার মৃত আয়েত আলীর ছেলে।
মামলার এজাহার ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ঘটনার প্রায় ১০ বছর আগে ঝর্ণা আক্তারের সঙ্গে ইসমাইল সাগর মিয়ার বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে দুই কন্যাসন্তান রয়েছে। তবে বিয়ের পর থেকেই পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্বামীর হাতে ঝর্ণা আক্তার নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বামীর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ২০১৬ সালের ১১ এপ্রিল রাত আনুমানিক ১১টার দিকে ঝর্ণা দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে গাজীপুরের ভাড়া বাসা থেকে বাজিতপুর উপজেলার নিলক্ষী নয়াহাটে মায়ের বাড়িতে চলে আসেন। সেখানে তিনি মায়ের কাছে স্বামীর নির্যাতনের কথা জানান।
পরদিন ১২ এপ্রিল রাত আনুমানিক ৭টা ৫০ মিনিটের দিকে ইসমাইল সাগর মিয়া অজ্ঞাতনামা আরও দুজনকে সঙ্গে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে যান। ওই সময় বাড়ির পূর্ব পাশে মাটির চুলায় রান্না করছিলেন ঝর্ণা আক্তার। মামলার এজাহার অনুযায়ী, সেখানে ইসমাইল সাগর কোমর থেকে ধারালো ছুরি বের করে ঝর্ণার ওপর হামলা চালান। রক্তাক্ত অবস্থায় ঝর্ণা মাটিতে লুটিয়ে পড়লেও হামলা থামেনি। তাঁকে মারধর ও ছুরিকাঘাত করা হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
ঝর্ণার চিৎকার শুনে তাঁর বোন স্বপ্না আক্তার, রাজিব মিয়া, সবুজ মিয়াসহ কয়েকজন এগিয়ে এসে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় আসামি আরও ক্ষিপ্ত হয়ে সবুজ মিয়ার হাতে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
গুরুতর আহত অবস্থায় ঝর্ণা আক্তারকে উদ্ধার করে বাজিতপুরের ভাগলপুর জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোর পর আর কোনো চিকিৎসাই তাঁর জীবন ফিরিয়ে দিতে পারেনি। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। একটি পরিবারের কাছে সেদিনের রাতটি হয়ে উঠেছিল শোকের রাত। দুই কন্যাসন্তান হারায় মাকে, আর একটি পরিবার হারায় তাদের প্রিয়জনকে।
ঘটনার পর নিহত ঝর্ণা আক্তারের মা মোছাম্মাৎ জাহেরা বেগম বাদী হয়ে ইসমাইল সাগর মিয়া ও অজ্ঞাতনামা আরও দুজনের বিরুদ্ধে বাজিতপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় রুজু করা হয়।
পুলিশ নিহতের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য কিশোরগঞ্জ মর্গে পাঠায়। পরে তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে সোমবার আদালত ইসমাইল সাগর মিয়াকে মৃত্যুদণ্ড এবং এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। প্রায় এক দশক আগের সেই রাতের রক্তাক্ত স্মৃতি, মায়ের বুক থেকে দুই সন্তানের ছিটকে পড়া, আর একটি সংসারের ভেঙে যাওয়ার বেদনার মধ্য দিয়ে অবশেষে আদালতের রায়ে হত্যার দায়ে শাস্তি পেলেন ঝর্ণার স্বামী।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন