প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন বিএনপি গৃহদাহের মধ্যে রয়েছে। নগরীর দুই প্রভাবশালী নেতা নজরুল ইসলাম মঞ্জু এবং শফিকুল ইসলাম মনার মধ্যে পুরোনো দ্বন্দ্ব আবারও মাথাচাড়া দিয়েছে। বর্তমানে খুলনা বিএনপি দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কোন্দল নিরসনের চেষ্টা করা হলেও তা সফল হয়নি। এই পরিস্থিতিতে জামায়াত নিজেদের সুবিধা নিতে চেষ্টা করছে। বিরোধী দল একক মেয়র প্রার্থী নিয়ে ভোটের মাঠে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। যদি কোন্দলের সমাধান না হয়, তাহলে জাতীয় নির্বাচনে যেমন দুটি আসন হারিয়েছে বিএনপি, তেমনি সিটি নির্বাচনে তাদের প্রার্থীও পরাজয়ের মুখোমুখি হতে পারেন।
খুলনার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এবং মহানগরের সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তিনি খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সিটি মেয়র মনিরুজ্জামান মনির সঙ্গে রয়েছেন। অপরদিকে মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল ইসলাম মনা এবং শফিকুল আলম তুহিনেরও রয়েছে বিপুল কর্মী সমর্থন। মঞ্জু দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর মনা গ্রুপ তাকে কোণঠাসা করে রাখে। তিনি দলে ফিরে আসার পর বিভাজন আবারও প্রকাশ্যে চলে আসে। মাঝে বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল দুই পক্ষকে এক করার চেষ্টা করেন।
খুলনা সিটি করপোরেশন comprises ৩১টি ওয়ার্ড, যার মধ্যে খানজাহান আলী, দৌলতপুর, খালিশপুর, সোনাডাঙ্গা, সদর থানা অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে নগরীতে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৮৯১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৭৭ হাজার ৯০৬ এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৭৯ হাজার ৯৬৭ জন। ১৯৮৪ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কেসিসিতে ২০ জন মেয়র দায়িত্ব পালন করেছেন, যাদের মধ্যে ৮ জন বিএনপির এবং ৫ জন আওয়ামী লীগের।
খুলনা সিটিতে বিএনপির প্রভাব দীর্ঘকাল ধরে ছিল। আওয়ামী লীগের সময়েও বিএনপির মেয়রপ্রার্থী এখানে জয়ী হয়েছেন। তবে এবারের নির্বাচনে বিএনপি সারাদেশে জয়ী হলেও খুলনা নগরীর একটি আসন হারিয়েছে।
বর্তমানে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু। গত সংসদ নির্বাচনে তিনি খুলনা-২ আসনে জামায়াত প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, গ্রুপিং, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে কম গুরুত্ব দেওয়ার কারণে এই পরাজয় ঘটে। মেয়র পদেও তিনি এবারও দাবিদার।
নগরীর বিভিন্ন মোড়ে বিএনপি-জামায়াতের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীরা পোস্টার সাঁটানো শুরু করেছেন। তারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি নগরবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। অনেক ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থীরাও প্রচার কার্যক্রম শুরু করেছেন। তারা মোড়ে মোড়ে পোস্টার, ব্যানার লাগানোসহ নানা সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নিয়ে নিজেদের জানান দিচ্ছেন।
কেসিসির সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর পালিয়ে যান। পরে অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসক দিয়ে কেসিসি পরিচালনা করে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে প্রশাসক পদ দেওয়া হয়। বর্তমানে মেয়র প্রার্থী হিসেবে বিএনপির পক্ষে তিনিই মাঠে রয়েছেন। তবে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন মহানগর বিএনপির সভাপতি ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান শফিকুল আলম মনা, মহানগর বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও ব্যবসায়ী তরিকুল ইসলাম জহির, মহানগর যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হুদা চৌধুরী সাগর প্রমুখ।
এদিকে জামায়াতের একক মেয়র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান। সাংগঠনিকভাবে কেসিসি নির্বাচন নিয়ে জামায়াত সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে। কারণ গত সংসদ নির্বাচনের পর থেকে তাদের একমাত্র টার্গেট কেসিসির মেয়রের চেয়ারটি। তারা রাজনৈতিকভাবে একক প্রার্থী ঘোষণা দিয়েই কাজ শুরু করেছেন। খুলনার ৩১টি ওয়ার্ডের মধ্যে বেশির ভাগ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে জামায়াত। অথচ এখনো বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়নি।
এদিকে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন এসএম মুশফিকুর রহমান। তিনি ২০১৮ ও ২০২৩ সালে কেসিসি নির্বাচন করেছিলেন।
বিএনপি সূত্রে জানা যায়, খুলনা সিটি মেয়র পদটি তারা কোনোভাবেই হারাতে চায় না। প্রশাসক মঞ্জু প্রতিনিয়ত তার রুটিন কাজের পাশাপাশি দলীয় কাজে অংশ নিচ্ছেন। তবে ডেঙ্গু মোকাবিলা, জলাবদ্ধতা এবং অন্যান্য কারণে তাকে পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এছাড়া সংসদ নির্বাচনের পর দলের অন্তর্কোন্দল আরও প্রকাশ্যে এসেছে। সর্বশেষ কেসিসি বাজেট মিটিংয়ে খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কাউকে দেখা যায়নি। নেতাদের দাবি, সব সংকট কাটিয়ে আগামী নির্বাচনে বিএনপি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে মেয়র পদটি প্রধানমন্ত্রীকে ‘উপহার’ দেবেন।
এদিকে নাম প্রকাশ না করে বিএনপির একাধিক নেতা যুগান্তরকে জানান, মহানগর বিএনপির সঙ্গে মঞ্জু-মনা ভাই গ্রুপের দ্বন্দ্বের অবসান হয়নি। যার প্রভাব গত সংসদ নির্বাচনে পড়েছিল। যদি আগামীতে এই গ্রুপিং থেকে যায়, তবে বিএনপি মেয়র পদটিও হারাতে পারে।
খুলনার ইতিহাসে মেয়র পদে জামায়াত কখনো আসেনি; কিন্তু এবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় বিএনপি খুলনার স্থানীয় দলীয় অন্তর্কোন্দল মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে। খুলনায় বিএনপি দেখতে যতটা ঐক্যবদ্ধ, ভেতরটা ততই ফাঁকা। নেতাদের ভাষ্য- এই সংকট মোকাবিলায় কাঁধে কাঁধ মিশিয়ে রাজনীতি করতে হবে। বিএনপি নেতাদের অন্তর্কোন্দলের কারণে ওয়ার্ড পর্যায়ে নেতৃত্ব সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি দলের কাছে মেয়র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন চাইব। দল মনোনয়ন দিলে অবশ্যই নির্বাচন করব।’
জামায়াতের মেয়র প্রার্থী অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘জামায়াত দ্বিতীয়বারের মতো এখানে মেয়র নির্বাচন করছে। এর আগে ছাতা প্রতীক নিয়ে সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার নির্বাচন করেছিলেন। আমরা কেসিসি মেয়র পদে জয় নিয়ে শতভাগ আশাবাদী। খুলনা-২ ও খুলনা-৩ আসন নিয়ে কেসিসির নির্বাচন। গত সংসদ নির্বাচনে এই দুটি আসন থেকে সাধারণ মানুষ আমাদের পক্ষে ব্যাপক সাড়া দিয়েছে। আশা করি কেসিসি নির্বাচনে জনগণ আমাদের পাশে থাকবে। আমরা ইতোমধ্যে অধিকাংশ ওয়ার্ডেই কাউন্সিলর প্রার্থী চূড়ান্ত করে ফেলেছি।’
কেসিসির বর্তমান প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘দল থেকে সিটি নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো বার্তা দেওয়া হয়নি। আগে ইউপি ও পৌরসভা নির্বাচন। এরপর সিটি নির্বাচন। আমাকে প্রধানমন্ত্রী যে দায়িত্ব দিয়েছেন, সেটি পালন করে যাচ্ছি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নগরবাসীর জন্য কাজ করছি। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কিছুই করব না।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন