প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার পর আবেগঘন একটি পোস্ট করেছেন তার মা, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) তিনি তার ফেসবুক পেজে এই আবেগঘন পোস্টটি প্রকাশ করেন।
ছেলের জন্য আবেগে আপ্লুত হয়ে তিনি লেখেন, ‘মা, তুমি তো বলেছিলে আমি তোমার পৃথিবী… আজ সেই পৃথিবীটা এত নিঃশব্দ কেন? আমি তো আর তোমার কাছে ফিরব না মা… শুধু আমার জন্য একটু দোয়া করো। আর আমার চলে যাওয়ার সত্যটা যেন চাপা না পড়ে।’
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুর আড়াইটার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানাধীন ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে বের হয়ে অপ্রতিম আর ফেরেনি। পরবর্তী সময়ে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী জঙ্গল লালমাই সানন্দা পাহাড় এলাকা থেকে অপ্রতিমের লাশ উদ্ধার করা হয়।
এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত চারজনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। ঘটনার পর হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন কারণ উঠে এসেছে। পুলিশ জানায়, আইফোন ছিনিয়ে নিতেই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়।
অপ্রতিমের পরিবারের দাবি, তাকে হত্যার পেছনে শুধুমাত্র আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার কারণ নয়। মাদকের বিরুদ্ধে ডা. নাহিদার কঠোর পদক্ষেপের কারণে সালমানপুর এলাকার মাদকচক্র তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছে। দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করে কৌশলে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
ঘাতকদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে নেপথ্যের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন হতে পারে বলে দাবি করেছে ভুক্তভোগী পরিবার।
এদিকে, অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগমের অভিযোগ, পূর্ববিরোধের কারণে তার ছেলেকে এভাবে হত্যা করা হয়েছে। বর্তমানে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে একটি শ্রেণি তার ছেলেকে অপবাদ দিচ্ছে।
অপ্রতিমকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলা বিভিন্ন প্রচারের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম। মঙ্গলবার রাতে কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা তার বাসায় দেখা করতে গেলে তিনি ক্ষোভের কথা জানান।
নাহিদা বেগম বলেন, "আমার দুধের শিশু, তাকে ব্লেমিং করা আমি কোনোদিন মেনে নেব না। আমার দুধের বাচ্চা, আমার ছেলে বোঝে না। তাকে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে, দীর্ঘদিন সময় নিয়ে বন্ধু বানিয়ে, সবার কাছে ভিকটিম বানিয়ে দিয়ে বলছে, ‘দেখো, ও আমাদেরই একজন সদস্য, ও আমাদের সঙ্গে খেলছে, ওর কারণে ও মরে গেছে’-আমি সেটা মানব না।"
তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আমার দুধের বাচ্চাকে কেন ভিকটিম ব্লেমিং করা হচ্ছে?’
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, তিনি শুধু তার ছেলের জন্য বিচার চান না। যারা তার ছেলেকে হত্যা করেছে, তারা যদি জেল থেকে বের হয়ে আসে, তাহলে আরও কত বাচ্চার জীবন নেবে, কত বাচ্চার জীবন ধ্বংস করবে-সেটা নিয়েও তিনি চিন্তিত। তিনি চান, এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার হোক।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম তার স্বামী ও একমাত্র সন্তান অপ্রতিমকে নিয়ে কোটবাড়ী গন্ধমতি এলাকার ভাড়া বাসায় থাকতেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্থানীয়রা জানান, ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বসে মাদকসেবনরত অবস্থায় সালমানপুর এলাকার ৮ কিশোরকে আটক করে শিক্ষার্থীরা। পরে প্রক্টর নাহিদা বেগম তাদের পুলিশে সোপর্দ করেন। সে সময় এসব মাদক নিয়ন্ত্রণে সালমানপুরের মাদক ব্যবসায়ী মিলন ও আল আমিনের নাম উঠে আসে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই ঘটনায় এলাকার কিশোর গ্যাং এবং মাদকচক্র অপ্রতিমের মায়ের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে এসব চিহ্নিত মাদক চক্রের ইন্ধন থাকতে পারে।
অনুসন্ধান বলছে, পূর্বপরিকল্পনার অংশ হিসাবে ১৮ সেপ্টেম্বর ছবি তোলার প্রলোভন দিয়ে ঘাতক তুহিন তাকে পাহাড়ে নিয়ে যায়। এ সময় ঘাতক ফাহাদ-কামরুলরা তাকে হত্যার জন্য ওতপেতে থাকে। পরে শ্বাসরোধ করে এবং বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা নিশ্চিত করে।
এদিকে পুলিশ বলছে, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার জন্যই ঘাতকরা তাকে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় জড়িত চার ঘাতক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। ঘাতকরাও আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার জন্যই তাকে হত্যা করেছে বলে জবানবন্দিতে আদালতকে বলেছে। তাছাড়া পরিবারের দাবি অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে অন্য কোনো ইস্যু রয়েছে কিনা পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে।
নিহত অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম বলেন, শুধু আইফোনের জন্য তার ছেলেকে হত্যা করা হয়নি। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তিনি মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ায় এলাকার মাদক সিন্ডিকেট তার ছেলেকে টার্গেট করেছে।
তিনি বলেন, যারা নেপথ্যে থেকে হত্যাকাণ্ডের ইন্ধন জুগিয়েছে তাদের খুঁজে বের করতে হবে। একটি শ্রেণি ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে।
অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে এসব অপরাধী ছাড়া পেয়ে যেন তার মতো অন্য বাবার বুক খালি করতে না পারে, সেদিকে কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে। এসব অপরাধীকে নিয়ে তার ভয় হচ্ছে। জেল থেকে বেরিয়ে ভবিষ্যতে তারা আরও খুনখারাবি করতে পারে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। ঘাতকরা আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। অন্যান্য বিষয়গুলোও তারা খতিয়ে দেখছেন।
সদর দক্ষিণ থানার ওসি রকিবুল ইসলাম বলেন, আলোচিত এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে তারা আরও চুলচেরা বিশ্লেষণ করবেন। অন্য কারও সম্পৃক্ততা থাকলে তদন্তে বেরিয়ে আসবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন